দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম। কিন্তু এই নগরের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো দীর্ঘস্থায়ী যানজট।
প্রতিদিন লাখো মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে সড়কে, বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি, কমছে জীবনযাত্রার মান।
এমন বাস্তবতায় নগরবাসীর জন্য আশার নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে মনোরেল প্রকল্প।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে পারলে চট্টগ্রামই হতে পারে বাংলাদেশের প্রথম মনোরেল সেবার নগরী।
শনিবার (৬ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রেস্ট হাউসে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মনোরেল প্রকল্প নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি জানান, যানজট নিরসনে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মূল কাজ আগামী বছর শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মেয়র বলেন, “এ প্রকল্পটির বাস্তবায়নের বিষয়ে আমি ইতিমধ্যে সড়ক ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি। প্রকল্পটির প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডিও সম্পন্ন হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহল অত্যন্ত আগ্রহী। যদি আমরা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাবনা যাচাই শেষ করতে পারি, তাহলে আগামী বছরের মধ্যে প্রকল্পটির মূল কাজ করা সম্ভব হবে। আর তাহলে বাংলাদেশের প্রথম মনোরেল চালু হতে যাচ্ছে চট্টগ্রামে।”
সম্ভাবনার পথে নতুন অগ্রগতি:
সভায় উপস্থিত ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-এর নির্বাহী পরিচালক মো. মশিউর রহমান জানান, ৫ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ডিটিসিএর পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান সরেজমিন পরিদর্শন করছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এবং মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করা হবে।
এ কার্যক্রমকে সংশ্লিষ্টরা প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রাথমিক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছেন। কারণ কোনো বৃহৎ গণপরিবহন প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, যাত্রী চাহিদা এবং নগর কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশার ওপর।
কেন মনোরেল নিয়ে এত আশাবাদ?
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত শহরে মনোরেল একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।
বিশেষ করে যেখানে সড়ক সম্প্রসারণের সুযোগ সীমিত, সেখানে উড়ালভিত্তিক এই পরিবহন ব্যবস্থা দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেও বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। পাহাড়, সমুদ্র ও ঘনবসতিপূর্ণ নগর কাঠামোর কারণে এখানে নতুন সড়ক নির্মাণ বা বিদ্যমান সড়ক প্রশস্ত করা সহজ নয়। ফলে বিকল্প পরিবহন অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।
গ্রেটার চিটাগাং ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী মনে করেন, চট্টগ্রামকে একটি স্মার্ট, আধুনিক ও টেকসই নগরে রূপান্তরের জন্য মনোরেল প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার ভাষায়, “চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, পাহাড়-সমুদ্রবেষ্টিত অবস্থান, সীমিত সড়ক অবকাঠামো এবং ঘনবসতিপূর্ণ নগর বিন্যাস বিবেচনায় এখানে মেট্রো রেলের তুলনায় মনোরেল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সমাধান হতে পারে।
মনোরেল নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম জায়গার প্রয়োজন হয় এবং বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থার ওপর কম প্রভাব পড়ে।”
শুধু যানজট নয়, অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব:
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, মনোরেল বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু যানজট কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা নগরের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং শিল্প খাতকে আরও গতিশীল করে তুলতে পারে।
চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক কেন্দ্র। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকেন্দ্রে যাতায়াত করেন।
উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হলে সময় ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদনশীলতাও বাড়বে।
একই সঙ্গে ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমে এলে পরিবেশ দূষণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে মনোরেল হতে পারে নগরের পরিবেশবান্ধব উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
স্মার্ট চট্টগ্রামের পথে নতুন মাইলফলক:
বর্তমান বিশ্বে একটি শহরের আধুনিকতার অন্যতম সূচক হলো তার গণপরিবহন ব্যবস্থা। সেই বিবেচনায় মনোরেল প্রকল্প চট্টগ্রামের জন্য শুধু একটি অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি নয়; বরং এটি হতে পারে ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থাপনার একটি রূপান্তরমূলক উদ্যোগ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, সুষ্ঠু অর্থায়ন এবং সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই প্রকল্প চট্টগ্রামের পরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
অপেক্ষা এখন ডিসেম্বরের:
প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপরই মূল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা, বহুদিনের যানজটের দুর্ভোগ কাটিয়ে আধুনিক ও গতিশীল নগরজীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এই উদ্যোগ।
আর যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগিয়ে যায়, তবে বাংলাদেশের প্রথম মনোরেলের গর্বের অধ্যায় রচিত হবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেই।
নগর উন্নয়নের মহাপরিকল্পনায় মনোরেল চট্টগ্রামের আগামী দিনের স্বপ্ন, সম্ভাবনা এবং পরিবর্তনের প্রতীক।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

