একসময় মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি জনশক্তির সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি ছিল চট্টগ্রাম।
ওমান, দুবাই কিংবা উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রবাসী নেটওয়ার্কের কারণে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যায় দীর্ঘদিন এগিয়ে ছিল জেলার নাম। কিন্তু সেই চিত্র এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, জনশক্তি রপ্তানির দৌড়ে শুধু পিছিয়েই পড়েনি চট্টগ্রাম, বরং একসময় যেসব জেলা তার অনেক পেছনে ছিল, এখন তারাই এগিয়ে গেছে বহুদূর।
কুমিল্লা ইতোমধ্যে সুস্পষ্ট ব্যবধানে শীর্ষে উঠে এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদপুরও অনেক ক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের আধিপত্যে দৃশ্যমান ভাটা পড়েছে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কেন বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমছে—সেই কারণ অনুসন্ধানে নেমেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।
সংখ্যার ভাষায় বদলে যাওয়া বাস্তবতা :
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সালের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে জনশক্তি রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু ছিল চট্টগ্রাম জেলা। বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যায় জেলার অবস্থান ছিল ঈর্ষণীয়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর থেকে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা নিম্নমুখী প্রবণতায় চলে যায়।
ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের (ওইপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে গেছেন ৮৭ হাজার ৫২৪ জন।
একই সময়ে কুমিল্লা থেকে বিদেশে গেছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৮ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৮৪ হাজার ৯২৪ জন।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ব্যবধানটি আরও স্পষ্ট হয়।
২০২৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে যান ৭ হাজার ৪০৮ জন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে যান ১৫ হাজার ১৩৮ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১৪ হাজার ৬৫৩ জন।
২০২৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ হাজার ১৬২ জন। সেখানে কুমিল্লা থেকে বিদেশে যান ৭৩ হাজার ৭৩৩ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৫৯ হাজার ৯২৭ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৪০ হাজার ৭৫৪ জন।
২০২৫ সালে ব্যবধান আরও বাড়ে। ওই বছর চট্টগ্রাম থেকে বিদেশ পাড়ি দেন ৪১ হাজার ৮৩৩ জন। বিপরীতে কুমিল্লা থেকে যান ৭৬ হাজার ৫০১ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৬৭ হাজার ২১৭ জন এবং চাঁদপুর থেকে ৪২ হাজার ৯৮২ জন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে গেছেন মাত্র ১২১ জন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে ২৬১ জন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ৫৪১ জন এবং চাঁদপুর থেকে ১৪৪ জন বিদেশে গেছেন।
অর্থাৎ যে চট্টগ্রাম একসময় ছিল বিদেশগামী জনশক্তির প্রধান ভরকেন্দ্র, সেই চট্টগ্রাম এখন জনশক্তি রপ্তানির নতুন বাস্তবতায় পিছিয়ে পড়া জেলার তালিকায় আলোচিত নাম।
ওমান–দুবাই নির্ভরতার ফাঁদ:
বিএমইটির কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রামের পতনের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মী গেলেও চট্টগ্রামের মানুষের আগ্রহ মূলত ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকেন্দ্রিক।
দীর্ঘদিন ধরে এসব দেশে চট্টগ্রামের মানুষের শক্তিশালী সামাজিক ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে নতুন বিদেশগামীরাও পরিচিত গন্তব্যের বাইরে যেতে আগ্রহ দেখান না।
জনশক্তি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে এক দশকের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা এবং বর্তমানে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে কর্মরত জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, “বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে কর্মী যায়। সূত্র- বিডিনিউজ
তবে চট্টগ্রামের লোক যায় মধ্যপ্রাচ্যের নির্দিষ্ট কিছু দেশে, যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ওমান ও দুবাই (সংযুক্ত আরব আমিরাত)। এসব দেশে ভিসা বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম থেকে জনসংখ্যা রপ্তানি কমেছে।”
তার তথ্য অনুযায়ী, ওমানে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের প্রায় ৬০ শতাংশই চট্টগ্রাম অঞ্চলের।
এই নির্ভরতাই এখন চট্টগ্রামের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বিকল্প শ্রমবাজারে প্রবেশে অন্যান্য জেলার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে জেলার অনেক কর্মী।
‘নিজেদের লোক যেখানে, সেখানেই যেতে চান’:
চট্টগ্রামের বিদেশগমন প্রবণতা নিয়ে একটি সামাজিক বাস্তবতার কথাও তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা।
জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, “চট্টগ্রামের লোকজন আঞ্চলিকতাকে প্রাধান্য দেয়। অন্য জেলার লোকজন কাজের সুবাদে যেকোনো দেশে যেতে আগ্রহী।
তবে সেক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লোকজন একটু ব্যতিক্রম। তারা নিজ এলাকার লোকজন যে দেশে বেশি, সেখানেই মূলত যেতে চান।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা একসময় সুবিধা তৈরি করলেও এখন তা সীমাবদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। কারণ শ্রমবাজার পরিবর্তিত হলেও গন্তব্য নির্বাচনের মানসিকতা খুব বেশি বদলায়নি।
সব ধরনের কাজে অনীহা?
বিএমইটির পর্যবেক্ষণে আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে। জহিরুল আলম মজুমদারের ভাষায়, “চট্টগ্রামের লোকজন সচরাচর সব ধরনের কাজ করতে চান না।
তারা মূলত ব্যবসা এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে আগ্রহী। দুবাই, ওমানে চট্টগ্রামের লোকজন বেশি থাকায় সেদিকে যাবার প্রবণতাও বেশি।”
অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (অ্যাটাব) সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবু জাফরও একই ধরনের মূল্যায়ন দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রামের লোকজন মূলত যেতে চান ওমান, দুবাই, কুয়েত ও সৌদি আরব। এসব দেশগুলোতে ভিসা বন্ধ থাকায় বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের লোকজনের সংখ্যা কমেছে।”
তার মতে, চট্টগ্রামের অনেক বিদেশগামী চাকরির চেয়ে ব্যবসায় বেশি আগ্রহী।
“চট্টগ্রামের লোকজন সব ধরনের পেশায় কাজ করতে চান না। আর চাকরির উদ্দেশ্যে কম যান। তারা যেতে চান ব্যবসা করতে। আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে তারা গিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে যুক্ত হয়ে যান।”
চট্টগ্রামেই তৈরি হচ্ছে বিকল্প সুযোগ:
তবে বিদেশগামী কর্মী কমে যাওয়ার পেছনে শুধু ভিসা সংকট বা পেশাগত পছন্দ দায়ী নয়। স্থানীয় অর্থনীতির পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চট্টগ্রামে শিল্পায়ন, কারখানা সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকেই বিদেশমুখী হওয়ার পরিবর্তে দেশেই কাজ খুঁজে নিচ্ছেন।
জহিরুল আলম মজুমদার বলেন, “চট্টগ্রামে বিভিন্ন ধরনের কারখানা গড়ে উঠেছে। সেগুলোতে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে কাজের ক্ষেত্রও বেড়েছে।
কেউ এক পেশায় থাকলে, সে অন্য পেশায় সহজেই যেতে পারছে। যেটা অন্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে উঠে না।”
অ্যাটাবের সাবেক চেয়ারম্যান আবু জাফরও একই বিষয় উল্লেখ করে বলেন, “চট্টগ্রামে কাজের বিভিন্ন সোর্স আছে, যেটা অন্য জেলার লোকজনের নেই। অনেক দেশ আছে দৈনিক ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতে হয়।
এসব দেশে চট্টগ্রামের লোকজন যায় না, কারণ দেশে তার আয়-রোজগার আরও বেশি হয়।”
এক যুগের পরিবর্তনের সামনে চট্টগ্রাম:
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে চট্টগ্রামের গল্প শুধু বিদেশগামী মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার গল্প নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরেরও গল্প।
একদিকে ওমান–দুবাই নির্ভরতার সংকট, অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের বিস্তার—দুই বিপরীত বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন এক চট্টগ্রাম গড়ে উঠছে।
তবে পরিসংখ্যান একটি কঠিন সত্যও সামনে আনছে—যে জেলা একসময় বিদেশগামী জনশক্তির প্রতীক ছিল, আজ সেই জেলার অবস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে।
জনশক্তি রপ্তানির মানচিত্র বদলে গেছে, আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রীয় আলোচনায় এখন চট্টগ্রাম নিজেই।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

