ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জনের চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
সোমবার (২০ এপ্রিল) দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই তালিকা প্রকাশ করেন।
এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পরিচিত রাজনৈতিক মুখ ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, যিনি ইতোমধ্যে এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।
কারা নির্যাতন থেকে সংসদে সম্ভাব্য যাত্রা
ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার রাজনৈতিক জীবন সংগ্রাম ও আইনি লড়াইয়ে পরিপূর্ণ। ২০১৫ সালে জঙ্গি সংগঠন ‘হামজা ব্রিগেড’-কে অর্থায়নের অভিযোগে র্যাব দায়ের করা একটি মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ১০ মাস ৮ দিন কারাবরণ করেন।
বিএনপি শুরু থেকেই এই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দাবি করে আসছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ১০ মার্চ আদালত তাকে এবং অন্যান্য আসামিদের নির্দোষ ঘোষণা করে খালাস দেন। এই রায়ের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক পুনরুত্থান আরও দৃঢ় হয়।
পারিবারিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা
১৯৭৭ সালের ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া শাকিলা ফারজানা হাটহাজারী উপজেলার চিকনদণ্ডী ইউনিয়নের লালিয়ারহাটস্থ বড় মীরা পাড়ার বাসিন্দা।
তিনি সাবেক চারবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপির সাবেক হুইপ মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের জ্যেষ্ঠ কন্যা।
২০০৯ সাল থেকে তিনি সরাসরি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম সুপ্রিম কোর্ট ইউনিটে মানবাধিকার সম্পাদক, আন্তর্জাতিক সম্পাদক এবং বর্তমানে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এছাড়া ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ২০২৪ সালে কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হন।
আন্দোলন, আইনি সহায়তা ও তৃণমূল সংযোগ
দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দলীয় আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। বিশেষ করে, দলীয় নেতাকর্মীদের আইনি সহায়তা প্রদান এবং মানবাধিকার রক্ষায় তার ভূমিকা দলের উচ্চপর্যায়ের নজরে আসে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রচারণায় অংশ নিয়ে নারীদের সঙ্গে উঠান বৈঠক ও গণসংযোগের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
এলাকায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস
সংরক্ষিত নারী আসনে তার মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার খবরে হাটহাজারী উপজেলা ও পৌরসভায় দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা গেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে তিনি এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামগ্রিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
আইনি লড়াই, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও তৃণমূল সক্রিয়তার মধ্য দিয়ে উঠে আসা শাকিলা ফারজানার এই মনোনয়ন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—এটি বিএনপির রাজনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাও বহন করছে। এখন দেখার বিষয়, সংসদে গেলে তিনি কতটা প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেন।
জাতীয় সংসদের মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে নারীদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে ৫০টি আসন। এর মধ্যে বিএনপি জোটের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬টি আসন।
ইতিমধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি ৩৬ জনকেই মনোনীত করেছেন। তারা হলেন: সেলিমা রহমান, শিরীন সুলতানা, রাশেদা বেগম হীরা, রেহানা আক্তার রানু, নেওয়াজ হালিমা আরলী, মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, বিলকিস ইসলাম, সাকিলা ফারজানা, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি, নিপুন রায় চৌধুরী, জীবা আমিনা খান, মাহমুদা হাবিবা, মোছা. সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, সানজিদা ইসলাম তুলি, সুলতানা আহমেদ, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার, ফেরদৌসী আহমেদ, বীথিকা বিনতে হোসাইন, মোছা. সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা আক্তার, মাধবী মার্মা, সেলিনা সুলতানা এবং রেজেকা সুলতানা।
এর আগে গত ১০, ১১ ও ১২ এপ্রিল তিন দিনে বিএনপি মনোনয়ন ফরম বিক্রি করে, যার মূল্য ছিল ২ হাজার টাকা। জমা দেওয়ার সময় প্রতিটি প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জামানত দিতে হয়।
মোট প্রায় ১,৩০০টি ফরম বিক্রি হয় এবং প্রায় ৯০০টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ১৭ ও ১৮ এপ্রিল বিভাগভিত্তিক প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখ: ২১ এপ্রিল। যাচাই-বাছাই: ২২ ও ২৩ এপ্রিল। আপিল: ২৬ এপ্রিল (নিষ্পত্তি ২৭-২৮ এপ্রিল), প্রার্থিতা প্রত্যাহার: ২৯ এপ্রিল, প্রতীক বরাদ্দ: ৩০ এপ্রিল এবং ভোটগ্রহণ: ১২ মে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


