বন্দরনগরী চট্টগ্রামে প্রতি বুধবার যেন নতুন করে লেখা হচ্ছে মানবিকতার গল্প। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে আয়োজিত নিয়মিত গণশুনানি এখন অসহায় মানুষের শেষ ভরসার জায়গা—যেখানে অভিযোগের পাশাপাশি মেলে তাৎক্ষণিক সহায়তা, আর ফিরে আসে বেঁচে থাকার নতুন আশা।
মাত্র ১৫ দিনের শিশুকে কোলে নিয়ে যখন স্বামী পরিত্যক্তা সুরাইয়া বেগম হাজির হন, তখন তার চোখে ছিল অনিশ্চয়তার ছাপ।
সন্তানের চিকিৎসা ও লালন-পালনের জন্য সহায়তা চাইতেই জেলা প্রশাসক তাকে নগদ অর্থ সহায়তা দেন। মুহূর্তেই বদলে যায় তার মুখের অভিব্যক্তি—কষ্টের মাঝে ফুটে ওঠে স্বস্তির হাসি।
একই দিনে আকবরশাহ থানার ফিরোজশাহ কলোনীর তাসলিমা আক্তারও পান সহায়তা। কিডনি ও ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত এই নারী স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে দুই সন্তান—জিহাদুল ইসলাম ও আরাফাত ইসলামকে নিয়ে অসহায় জীবন কাটাচ্ছিলেন।
তার আবেদন শুনে তাৎক্ষণিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে চিকিৎসা সহায়তার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসক।
বন্দর এলাকার মোছাম্মৎ লাইজু বেগম এসেছিলেন সন্তানের চোখের চিকিৎসার জন্য। দিনমজুর স্বামীর আয়ে চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু গণশুনানী থেকে সহায়তা পেয়ে আবারও চিকিৎসার আশা দেখছেন তিনি।
সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর নাজমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে চর্মরোগে ভুগছেন। স্বামী কর্মক্ষম নন। মানুষের বাসায় কাজ করে সংসার চালালেও চিকিৎসা ছিল অধরা। তার আবেদনেও সাড়া মেলে এই গণশুনানীতে।
মিরেরশ্বরাইয়ের রেমন্ডু ফিলিপ রায়, যিনি অসুস্থতায় একটি পা হারিয়েছেন, পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ছিলেন। তার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু অর্থ সহায়তাই দেননি, তার সন্তানের পড়াশোনার খোঁজও নেন জেলা প্রশাসক—যা উপস্থিত সবাইকে স্পর্শ করে।
এছাড়াও সহায়তা পেয়েছেন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বিধবা মাছুমা, হৃদরোগী মাবিয়া খাতুন, স্বামীহারা নাহার, অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য আবেদনকারী আর্জিনা আক্তার এবং চট্টগ্রাম কলেজের এক শিক্ষার্থী, যার পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
জানা গেছে, সর্বশেষ এই গণশুনানীতে ৭৪ জন সেবাপ্রত্যাশীর সমস্যা শোনা হয়। এর মধ্যে ৯ জন অসুস্থ ব্যক্তি ও ১ জন শিক্ষার্থীকে নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ৪৮ জন দুস্থ মানুষের মধ্যে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।
গণশুনানীতে আসা মানুষজন বলছেন, এখানে তাদের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয় এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফলে দিন দিন এই উদ্যোগ মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠছে।
একটি দিনের এই গণশুনানি শেষ হয়, কিন্তু রেখে যায় অসংখ্য হাসি, স্বস্তি আর নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা।
মানবিক নেতৃত্বে এমন উদ্যোগই বদলে দিতে পারে সমাজের অনেক অন্ধকার বাস্তবতা।


