back to top

ধর্মীয় সম্প্রীতির নতুন দিগন্ত: চবিতে স্বপ্নের ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’ উদ্বোধন

জ্ঞান যেখানে পূজিত, সেখানে সরস্বতীর আবাস

প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৮:১৬

জ্ঞানই শক্তি, জ্ঞানই মুক্তি—এই চিরন্তন দর্শনকে ধারণ করেই নতুন এক আধ্যাত্মিক-জ্ঞানচর্চার দিগন্ত উন্মোচিত হলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট সংলগ্ন প্রায় ২০ হাজার বর্গফুট জমির ওপর গড়ে ওঠা ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’ এখন শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন।

আট বছরের নির্মাণযজ্ঞ শেষে উৎসবমুখর পরিবেশে গত সোমবার মন্দির উৎসর্গ ও শ্রীবিগ্রহ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে আধ্যাত্মিক আবেশের সূচনা হয়েছিল, তা আজ পূর্ণতা পেয়েছে।বিশ্ববিদ্যালয়

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে, যেখানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে মন্দিরের দ্বার উন্মোচন করেন।

তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ভূমি ও পার্বত্য অঞ্চল বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার এবং মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।বিশ্ববিদ্যালয়

উদ্বোধন-পরবর্তী আলোচনা সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকানের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন, চবি কেন্দ্রীয় মন্দির উদ্বোধন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. তাপসী ঘোষ রায়।

পাশাপাশি অদুল-অনিতা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অদুল কান্তি চৌধুরী ও কো-চেয়ারম্যান অনিতা চৌধুরী।

জানা যায়, ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত সনাতন ধর্ম পরিষদের দাবির প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রশাসন মন্দির নির্মাণের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেয় এবং পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে শুরু হয় নির্মাণকাজ, যা দীর্ঘ আট বছরের পথ পেরিয়ে আজকের এই দৃষ্টিনন্দন রূপ পেয়েছে।

মনোরম স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মন্দির দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম ‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’ হিসেবে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।বিশ্ববিদ্যালয়

যার মূল স্থাপনা নির্মাণে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করেছেন অদুল-অনিতা ফাউন্ডেশন। দানবীর অদুল কান্তি চৌধুরী ও অনিতা চৌধুরীর ব্যক্তিগত অনুদানেই বাস্তবায়িত হয়েছে এই মহতী উদ্যোগ।বিশ্ববিদ্যালয়

যেখানে নকশা ও প্রকৌশল সহায়তা দিয়েছে ‘এস্ট্রো’ এবং ইন্টেরিয়র সজ্জায় যুক্ত ছিল ‘দি-অ্যাড কমিউনিকেশন’, আর সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত মন্দির নির্মাণ ও পরিচালনা কমিটি।

বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন, প্রজ্ঞাবান মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পেশাগত জ্ঞানের পাশাপাশি আধ্যাত্মিক জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম এবং সেই লক্ষ্যেই এই মন্দিরকে শুধু পূজা-উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আধ্যাত্মিক চর্চা, মানবকল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।

যেখানে ভবিষ্যতে একটি বৈদিক গ্রন্থাগার, নিয়মিত সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের জন্য অডিটোরিয়াম, শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক উৎকর্ষ সাধনে ধ্যানকেন্দ্র এবং সনাতনী শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যা দূরীকরণে একটি আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও জানান চবি কেন্দ্রীয় মন্দির উদ্বোধন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. অঞ্জন কুমার চৌধুরী।

পাশাপাশি দুর্যোগকালীন সহায়তা ও দরিদ্রদের জন্য কল্যাণ তহবিল গঠনের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়।

উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান তাঁর বক্তব্যে বলেন, একটি দৃষ্টিনন্দন মন্দির স্থাপনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ধর্মীয় সম্প্রীতির এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে দানবীর অদুল কান্তি চৌধুরীর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়।

আর অদুল কান্তি চৌধুরী নিজেও অনুভব প্রকাশ করে বলেন, সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মচর্চার অসুবিধার কথা জেনে এই মন্দির নির্মাণে অংশ নিতে পারা তাঁর জন্য এক বিরল সৌভাগ্য।

‘সরস্বতী জ্ঞান মন্দির’ এখন শুধু পূজার স্থান নয়, বরং জ্ঞান, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক সম্মিলিত অঙ্গন, যেখানে প্রতিদিনের প্রার্থনার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠবে চিন্তার দীপ্তি, চেতনার বিকাশ এবং মানবকল্যাণের এক আলোকিত ভবিষ্যৎ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি