চট্টগ্রামের হৃদস্পন্দন যেন প্রতি বছর একদিন এসে থমকে দাঁড়ায় লালদীঘির ঐতিহাসিক ময়দানে। বাংলা বর্ষপঞ্জির ১২ বৈশাখ এলেই নগরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অনন্য উচ্ছ্বাস।
ইতিহাস, ঐতিহ্য, শক্তি, সাহস, বাণিজ্য আর লোকজ আনন্দের অপূর্ব মেলবন্ধনে মুখর হয়ে ওঠে লালদীঘি।
আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা ও তাকে ঘিরে বৈশাখী মেলা শুধু একটি বার্ষিক আয়োজন নয়; এটি চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বল প্রতীক, শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক মহাউৎসব।
ইতিহাসের রিংয়ে প্রতিরোধের সূচনা:
১৯০৯ সাল। ব্রিটিশ শাসনের দমন-পীড়নে উত্তাল ভারতবর্ষ। চারদিকে অন্যায়, শোষণ আর বঞ্চনার বিরুদ্ধে জমে উঠছিল ক্ষোভ। সেই অস্থির সময়ে বদরপাতির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর উপলব্ধি করেছিলেন, তরুণদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলা জরুরি। আর সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় বলীখেলা।
বাহ্যত এটি ছিল মল্লযুদ্ধের প্রতিযোগিতা, কিন্তু অন্তর্গত উদ্দেশ্য ছিল আরও গভীর। তরুণদের সাহসী, সুসংগঠিত ও লড়াকু করে গড়ে তোলা। এক অর্থে এটি ছিল ব্রিটিশবিরোধী চেতনা জাগ্রত করার এক অভিনব সামাজিক উদ্যোগ। প্রকাশ্যে বিনোদন, ভেতরে প্রতিরোধের প্রস্তুতি।
১১৭ বছরের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতা:
এবার আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা পা দিয়েছে ১১৭ বছরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক করোনাভাইরাস মহামারির কারণে কয়েক বছর বিরতি এলেও এই আয়োজনের প্রাণশক্তি কখনো হারায়নি। প্রতিবারই আরও নবউদ্যমে, আরও বৃহত্তর পরিসরে ফিরে এসেছে।
আজ শনিবার বেলা তিনটায় ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে রিংয়ে নামবেন ১০৮ জন বলী। তাঁদের মধ্য থেকে শেষ পর্যন্ত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট উঠবে একজনের মাথায়।
গতবারের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার মো. শরীফ, যিনি ‘বাঘা শরীফ’ নামে পরিচিত, এবারও মাঠে নামছেন। থাকছেন গতবারের রানার্সআপ মো. রাশেদ, অর্থাৎ রাশেদ বলীও। তাঁদের অংশগ্রহণকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস তুঙ্গে।
বলীখেলাকে ঘিরে বৈশাখী মেলার বর্ণিল জগৎ:
বলীখেলার সঙ্গে সঙ্গে লালদীঘিকে ঘিরে বসে শতবর্ষী বৈশাখী মেলা। এই মেলা যেন চট্টগ্রামের লোকজ জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনের সড়ক থেকে লালদীঘি মোড়, কে সি দে রোড, সিনেমা প্যালেস মোড় হয়ে কোতোয়ালি পর্যন্ত বিস্তৃত কয়েক কিলোমিটার এলাকা পরিণত হয় রঙ, শব্দ আর মানুষের মিলনমেলায়।
রাস্তার দুই পাশে সারি সারি অস্থায়ী দোকান। কোথাও ঘর সাজানোর উপকরণ, কোথাও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিস, কোথাও শিশুদের খেলনার সমাহার। খাট-পালং, ঝাড়ু, থালাবাসন, দা, বঁটি, ছুরি, আয়না, ফুলদানি, টব, বাঁশ-বেতের তৈরি নান্দনিক সামগ্রী-কী নেই সেখানে!
লোকজ সংস্কৃতির প্রাণস্পন্দন:
মেলার অন্যতম আকর্ষণ লোকজ বাদ্যযন্ত্র। আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে বসে একতারা, দোতারা ও ডুগডুগি সাজিয়ে ক্রেতাদের মন কাড়ছিলেন কুষ্টিয়ার মোহাম্মদ সাজু।
লালনের আখড়ার পাশের পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী শুধু বাদ্যযন্ত্র বিক্রি করেন না; বহন করেন বাংলার লোকঐতিহ্যের এক অমূল্য ধারা। প্রায় এক দশক ধরে দেশের বিভিন্ন মেলায় ঘুরে বেড়ানো সাজু টানা আট বছর ধরে আসছেন চট্টগ্রামের এই মেলায়। তাঁর ভাষায়, এখানে শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সম্পর্কও গড়ে ওঠে।
হাজারি গলিতে আবার বাঁশির সুরে ক্রেতাদের টানছিলেন রাজশাহীর গগন মণ্ডল। চার দশকের অভিজ্ঞ এই বিক্রেতার সুর যেন মেলার কোলাহলের মাঝেও আলাদা এক আবেশ ছড়িয়ে দেয়।
জীবিকার বড় উৎস, আনন্দেরও ঠিকানা :
এই মেলা শুধু ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের জন্য নয়, হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য এটি বছরের অন্যতম বড় আয়ের উৎস। তিন দিনের এই আয়োজন অনেকের জীবনে এনে দেয় নতুন সম্ভাবনা, নতুন স্বপ্ন।
ফেনী থেকে আসা ক্ষুদ্র ঝাড়ু বিক্রেতা রবিউল আলম প্রতিবেদককে জানিয়েছে, তারা প্রায় ৩০ বছর ধরে এই মেলায় ঝাড়ু বিক্রি করছেন। তাঁর মতে, ঝাড়ুর চাহিদা কখনো কমে না। তিনি গত বুধবার থেকে সিনেমা প্যালেস এলাকায় ঝাড়ু বিক্রি শুরু করেছেন। ভালই বিক্রি হচ্ছে।
একইভাবে চন্দনাইশ থেকে আসা শাহেদ আকবর নামে অপর এক ভাসমান আইসক্রিম বিক্রেতা বলেছেন, আইসক্রিম শিশু-কিশোর থেকে তরুণ-তরুনি সকলের প্রিয়। মেলা শুরু থেকে তার দোকানের সামনে ভিড় লেগেই থাকে।
শিশুদের রঙিন স্বপ্নের মেলা:
রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা, বাঁশের গাড়ি, ঘুড়ি, ছোট ছোট পুতুল, দোলনা, আলো জ্বলা গাড়ি, হাতে ঘোরানো চরকি, শিশুদের জন্য মেলা যেন এক জাদুর রাজ্য।
সারি সারি খেলনার দোকানে তাদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। অভিভাবকেরাও সন্তানের আনন্দে সঙ্গী হন।
কেনাকাটা, স্মৃতি আর পারিবারিক বন্ধন :
নগরীর পাথরঘাটা ইকবাল রোড থেকে স্ত্রী নিশি ও মেয়েদের নিয়ে মেলা ঘুরতে এসেছেন রানা সেন।
তিনি মেয়ের জন্য কিছু খেলনা এবং ঘর সাজানোর লক্ষ্যে কিনেছেন ফুলদানি ও টব। বারান্দায় বেলি ফুল লাগানোর পরিকল্পনা তাঁর।
অন্যদিকে, কাস্টমস আনন্দিবাজার এলাকা থেকে শফিক ও আফিয়া দম্পতি মেলা ঘুরতে এসে আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে কিনেছেন দা, বঁটি ও ছুরি।
এভাবেই মেলা শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; এটি পারিবারিক বন্ধন, স্মৃতি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনারও এক মিলনক্ষেত্র।
সন্ধ্যার আলোয় উৎসবের নতুন রূপ:
সন্ধ্যা নামতেই লালদীঘি যেন নতুন সাজে সেজে ওঠে। দোকানে দোকানে জ্বলে ওঠে রঙিন আলো। ভিড় আরও ঘন হয়।
তরুণেরা মোবাইলে ছবি তোলেন, লাইভ করেন। শিশুরা খেলনায় মেতে ওঠে। শহরের ব্যস্ততা ছাপিয়ে এখানে তৈরি হয় অন্য এক জগৎ—উৎসব, উচ্ছ্বাস আর মানুষের অকৃত্রিম মিলনের জগৎ।
চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক :
আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা আজ আর শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়। এটি চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
লালদীঘির মাটিতে যখন বলীরা লড়াই করেন, তখন সেখানে শুধু শক্তির প্রদর্শন হয় না; পুনর্জাগরিত হয় এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে লালিত ঐতিহ্য, আত্মমর্যাদা ও প্রতিরোধের চেতনা।
শিকড়ের টানে, ইতিহাসের আহ্বানে :
সময় বদলেছে, শহর বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি লালদীঘির প্রতি মানুষের টান। বলীদের লড়াই দেখতে, মেলা ঘুরতে, স্মৃতি রোমন্থন করতে কিংবা নতুন স্মৃতি গড়তে প্রতি বছর এখানে ভিড় জমান হাজারো মানুষ।
লালদীঘির এই বৈশাখী আয়োজন তাই কেবল একটি উৎসব নয়। এটি ইতিহাসের উত্তরাধিকার, সংস্কৃতির ধারক, মানুষের মিলনমেলা এবং চট্টগ্রামের প্রাণের স্পন্দন।
১১৭ বছরের গৌরবময় পথচলায় আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলা আজও একইভাবে উচ্চারণ করে—ঐতিহ্য কখনো পুরোনো হয় না; সময়ের সঙ্গে তার আবেদন কেবল আরও গভীর, আরও অনিবার্য হয়ে ওঠে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



