চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সার্কেলের অধীনে বাস্তবায়নাধীন একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে উঠেছে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার, অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) খ. ম. জুলফিকার তারেক।
একজন “সচেতন নাগরিক” দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ দাখিল করা লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, চট্টগ্রামের একাধিক উপজেলায় চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে বিপুল সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, বাঁশখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, পটিয়া, বোয়ালখালী, সন্দ্বীপ ও পতেঙ্গা—এই বিস্তৃত এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়া বিল তৈরি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কাজের বাস্তবায়নে অনিয়মের ধারাবাহিকতা দেখা গেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু: হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন:
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে কয়েক হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও আত্মসাৎ হয়েছে। একই সঙ্গে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও তোলা হয়েছে, যার গন্তব্য হিসেবে কানাডার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো কোনো স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের রায়ে প্রমাণিত নয়।
এরপরও সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এবং অভিযোগের ব্যাখা নিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) খ. ম. জুলফিকার তারেকের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, এখন খুব ব্যস্ত সময় পার করছেন।
আগামী ১৩ জুন শনিবার নতুন উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, খাল পুনঃখনন প্রকল্প উদ্বোধন করতে কক্সবাজার যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দিনব্যাপী এ সফরে তিনিও প্রধানমন্ত্রীর সাথে থাকবেন। তাই এখন এসব বিষয়ে কথা বলার সময় নেই। শনিবার অনুষ্ঠান শেষ করে রবিবারের দিকে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন।
এদিকে চট্টগ্রামের একাধিক উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্প থেকেও পাওয়া গেছে নানান অভিযোগ। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে তুলে ধরা হয়েছে পটিয়া উপজেলার কয়েকটি প্রকল্পের অনিয়মের খবরে। যেসব অভিযোগেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) খ. ম. জুলফিকার তারেকের নাম উল্লেখ করেছেন অনেকেই।
ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ ও হয়রানির অভিযোগ:
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ অনুযায়ী, পটিয়ার প্রকল্প ঘিরে ভূমি অধিগ্রহণের নামে প্রকৃত জমির মালিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ না দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে।
তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শতকোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থ লোপাটের ঘটনা ঘটেছে, যা তারা “পুকুরচুরি” হিসেবে বর্ণনা করেন।
পটিয়ার প্রকল্প ঘিরে ক্ষোভ ও অনিয়মের অভিযোগ:
পটিয়া এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের যোগসাজশে কমিশন বাণিজ্য ও টেন্ডার অনিয়মের কারণে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কার্যত ব্যর্থতার দিকে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলার কারণে “মুখ থুবড়ে পড়ার” পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বিগত প্রায় ১৫ বছর ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পাউবোর বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে কিছু প্রকৌশলী ও ঠিকাদার পরস্পরের সঙ্গে যোগসাজশে কাজ ভাগাভাগি করেছেন বলেও তারা দাবি করেন।
তদারকির ঘাটতি ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন:
স্থানীয়দের অভিযোগ, উন্নয়ন প্রকল্পে মাঠ পর্যায়ে পাউবো কর্মকর্তাদের কার্যকর তদারকি প্রায় নেই বললেই চলে।
তাদের মতে—কাজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, ঠিকাদারদের ওপর কার্যকর নজরদারি নেই। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং ব্যয়ের তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি অনেক কম।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা মন্তব্য করেন, “পাউবোর প্রকল্প মানেই যেন অনিয়ম ও দুর্নীতির একটি পুনরাবৃত্ত চিত্র।”
অর্থ লোপাট ও সিন্ডিকেট অভিযোগ:
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পে যতটুকু কাজ হয়েছে তার তুলনায় অনেক বেশি অর্থ একটি সিন্ডিকেট ও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার মধ্যে ভাগ হয়েছে।
তাদের দাবি, বিগত দেড় দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে কয়েকশ কোটি টাকার অনিয়ম ও অর্থ লোপাট হয়েছে।
এক্ষেত্রে পাউবোর কিছু প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে সুবিধা ভাগাভাগির অভিযোগও উঠেছে। কেউ কেউ অভিযোগের তীরে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) খ. ম. জুলফিকার তারেকের নাম।
শ্রীমাই খাল প্রকল্প: উন্নয়ন নাকি অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি?
পটিয়ার শ্রীমাই খালে ১৩৩ কোটি টাকার মাল্টিপারপাস হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম প্রকল্প এবং ১১৫৮ কোটি টাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী—ব্লক তৈরিতে নিম্নমানের বালি ও পাথর ব্যবহৃত হচ্ছে। সাইটে পাউবো কর্মকর্তাদের উপস্থিতি থাকার নিয়ম থাকলেও তা মানা হয়নি।
তাছাড়া ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ব্লক না বসিয়ে অপ্রয়োজনীয় স্থানে বসানো হয়েছে। বর্ষার আগেই একাধিক স্থানে ব্লক সরে গিয়ে ধসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং প্রকল্পের বড় অংশ এখনো অসম্পূর্ণ।
একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ভাঙন রোধ ও পানি ব্যবস্থাপনা—কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করছে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র: ভাঙছে বাঁধ, সরে যাচ্ছে ব্লক:
সরেজমিনে পাওয়া অভিযোগে বলা হয়, সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও ঝড়ের পর শ্রীমাই খালের বিভিন্ন অংশে বসানো কংক্রিট ব্লক সরে গিয়ে বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। কয়েকটি এলাকায় মাটি ধসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলেও পাঁচটি প্যাকেজের কোনোটি ৭০ শতাংশ অগ্রগতি অতিক্রম করতে পারেনি বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
বিল, ঠিকাদার ও যোগসাজশের অভিযোগ:
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে ঠিকাদার ও কিছু কর্মকর্তার মধ্যে সমন্বিত একটি “সিন্ডিকেট” কাজ করছে।
তাদের ভাষ্যমতে—কাজের মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দুর্বল, বিল অনুমোদনে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া প্রকল্প এলাকায় তদারকির অভাব রয়েছে এবং কাজের মানের চেয়ে বিল উত্তোলনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প এখন “কাগজে উন্নয়ন, মাঠে ক্ষয়”।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক খ. ম. জুলফিকার তারেক বলেন, “আমার জানা মতে এমন কোনো অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। যদি কোথাও অনিয়ম পাওয়া যায়, তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, প্রকল্প এখনো চলমান এবং মাঠ পর্যায়ের কিছু ত্রুটি থাকলেও তা সংশোধন করা হচ্ছে।
পাউবো পটিয়ার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার বলেন, কাজ এখনো শেষ হয়নি এবং কিছু ত্রুটি স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারে, যা সংশোধন করা হবে। বালু উত্তোলনের বিষয়ে প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে পুরো এ অভিযোগ ঘিরে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কেন গুণগত মান নিশ্চিত হয়নি? মাঠ পর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল?
ঠিকাদার নির্বাচন ও বিল অনুমোদন প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ? অভিযোগগুলো কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি কাঠামোগত দুর্বলতার ফল?
বিদেশ সফর ও সম্পদ সংক্রান্ত প্রশ্ন?
সচেতন ওই ব্যক্তির অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকৌশলী জুলফিকার তারেক নিয়মিত কানাডা যাতায়াত করেন এবং সেখানে সম্পদের মালিকানা রয়েছে।
এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জনসমক্ষে উপস্থাপন করা হয়নি। তবে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তার পাসপোর্ট রেকর্ড পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
এ বিষয়েও জানতে চাইলে কোন বক্তব্য দেননি খ. ম. জুলফিকার তারেক।
এদিকে অপর একটি সূত্র দাবি করেছে অতীতেও চট্টগ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিভিন্ন খাল খনন ও বেড়িবাঁধ প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
সে সময়ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চালানোর তথ্য রয়েছে।
চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় পানি ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য নেওয়া এই প্রকল্পগুলো এখন এক নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে “অভিযোগ” হিসেবেই বিবেচনা করা জরুরি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবায়নের মাঠচিত্র এবং অর্থনৈতিক পরিসরের আকার—সব মিলিয়ে প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
দুদকের সম্ভাব্য তদন্তই এখন নির্ধারণ করবে—এটি সত্যিই উন্নয়ন প্রকল্প ছিল, নাকি উন্নয়নের আড়ালে বড় ধরনের অনিয়মের গল্প।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

