চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাস্তবায়নাধীন বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টরা জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। তবে প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে ধীরগতি ও নতুন চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১১৫৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পটি সাতটি ভাগে বিভক্ত।
এর আওতায় নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ, ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ, সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন, খাল পুনঃখনন, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ এবং ভূমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৫টি প্যাকেজে কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।
দৃশ্যমান অগ্রগতি
প্রকল্প এলাকায় খালের দু’পাশে আরসিসি ব্লক দিয়ে তীর প্রতিরক্ষা কাজ চলছে। ভাটিখাইন, ছনহরা ও হাইদগাঁও ইউনিয়নে ৪.৪০ কিলোমিটার তীর প্রতিরক্ষা কাজের মধ্যে প্রায় ৩.৫০ কিলোমিটার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এতে শ্রীমাই খালের ভাঙন রোধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পটিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের আওতায় ৮টি রেগুলেটর নির্মাণ এবং ৩০.১০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
বাস্তব অগ্রগতিতে দেখা যায়, ১১টি খালের ৩০.২০ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে গরুলুডা খালের ১০ কিলোমিটার, শ্রীমাই খালের ৫ কিলোমিটার, চানখালি খালের ৩.৫ কিলোমিটারসহ অন্যান্য খালের কাজ শেষ হয়েছে।
এছাড়া ১.৮০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ২.৭০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। নদীতীর সংরক্ষণ কাজের ৯২ শতাংশ এবং ৪.১০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের ৮৩ শতাংশ শেষ হয়েছে।
২৫টি সেচ রেগুলেটরের মধ্যে ৬৮ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নাইখাইন গ্রামে ৮০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২ মিটার প্রস্থের ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণকাজের ৪০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে।
লক্ষ্য ও সম্ভাবনা
প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোতে পানি নিষ্কাশন ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা। ফসল উৎপাদনের নিবিড়তা ১৯৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৩০.৫৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৩২০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ২.৯৫ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ২৫.৫১ কিলোমিটার বাঁধ এবং ৪.১০ কিলোমিটার ফ্লাড ওয়াল নির্মাণের মাধ্যমে প্রায় ১৩,৫০০ হেক্টর জমির ফসল বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।
এছাড়া ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সারা বছর সেচ কার্যক্রম চালু রাখা, রবি, খরিফ ও বোরো ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মিঠা পানির মৎস্য চাষ বৃদ্ধি এবং খাল পুনঃখননের ফলে প্রাকৃতিক মাছের চলাচল (মাইগ্রেশন) সহজ হবে, যা এলাকার বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হবে।
চান্দখালী নদীর ওপর নির্মাণাধীন পথচারী সেতুর মাধ্যমে খানমোহনা ও ধলঘাট স্টেশনের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা
এলাকাবাসী জানান, আগে জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে ধান নষ্ট হতো। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ১৭টি ইউনিয়নের মানুষ উপকৃত হবে।
দীর্ঘদিন ধরে পটিয়ার অনেক কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে ছিল, এই প্রকল্পের মাধ্যমে সেসব জমি আবার চাষাবাদের আওতায় আসবে বলে তারা আশা করছেন।
চ্যালেঞ্জ ও শঙ্কা
তবে প্রকল্পের সব অংশ সমান গতিতে এগোয়নি। ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এখন পর্যন্ত মাত্র ১৭.১০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের কারণে প্রকল্পের অগ্রগতি কিছুটা ধীর হয়েছে।
ঠিকাদাররা চিঠির মাধ্যমে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন, জ্বালানি তেলের সংকট অব্যাহত থাকলে চলমান উন্নয়ন কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, প্রকল্পের ফ্লাড ওয়াল, বেড়িবাঁধ ও সিসি ব্লকের কাজসহ প্রায় ৭০ শতাংশ ভৌত কাজ শেষ হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পটিয়ার কয়েক লাখ মানুষ উপকৃত হবে। বছরে প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উৎপাদন সম্ভব হবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। পাশাপাশি নদী ও খালের ভাঙন থেকে সুরক্ষা এবং লবণাক্ত পানির প্রবেশও রোধ করা যাবে।
সময়সীমা ও অগ্রগতি
জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত বাস্তবায়নকাল নির্ধারিত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১,১৫৮৩৬.০০ লাখ টাকা। চলতি এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ১০,০০৯.০০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে আর্থিক অগ্রগতি ৫.৯৮ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি ৬.২০ শতাংশ।
তবে ভৌত কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হলেও প্রকল্পের বাকি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে হলে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত সমাধান জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পটিয়ার এই মেগাপ্রকল্প একদিকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও সেচ সুবিধা সম্প্রসারণে বড় সম্ভাবনা তৈরি করছে; অন্যদিকে ভূমি অধিগ্রহণের ধীরগতি ও জ্বালানি সংকট প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নও তুলছে।



