চাকরির জন্য যার সাফল্য কামনায় একসময় প্রার্থনায় মুখর ছিল পুরো গ্রাম, সেই বুলেট বৈরাগী আজ আর নেই।
ছিনতাইকারীদের নির্মম হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় পরিবারের কাছে ফেরার পথেই থেমে যায় তার জীবনের সব স্বপ্ন।
মাত্র দেড় বছর আগে ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। অল্প সময়েই সততা, বিনয় আর কর্মনিষ্ঠায় সবার আস্থা অর্জন করেছিলেন।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—চতুর্থ বিবাহবার্ষিকী পেরিয়ে, একমাত্র ছেলে অব্যয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিনের ঠিক দুই দিন আগে, ২৪ এপ্রিল রাতে নিভে গেল তার জীবনপ্রদীপ।
সেদিন রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন বুলেট। পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেন।
রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে মাকে জানান, তিনি বাসে আছেন, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাসায় পৌঁছে যাবেন। সেটিই ছিল পরিবারের সঙ্গে তার শেষ স্বাভাবিক কথা।
কুমিল্লায় নেমে বাড়ি ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন তিনি। সেখানে আগে থেকেই ওত পেতে ছিল একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্র। চালকসহ চারজন সদস্য যাত্রী সেজে বসেছিল।
‘আর একজন হলেই ছেড়ে দেব’—এই আশ্বাসে নিশ্চিন্ত হয়ে ওঠেন বুলেট। কিন্তু সেটিই ছিল মৃত্যুর ফাঁদ।
কিছু দূর যাওয়ার পর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তার কাছে থাকা মূল্যবান সবকিছু ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।
এরপর নির্মমভাবে মারধর করে চলন্ত সিএনজি থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় ফেলে দেয়। মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তার।
পরদিন ২৫ এপ্রিল সকাল পৌনে ৯টার দিকে আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে ময়নামতি হাইওয়ে থানা পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। শরীরে ছিল একাধিক আঘাতের চিহ্ন।
রাস্তার পাশে পড়ে ছিল স্বপ্নবাজ এক সন্তানের নিথর দেহ:
বুলেট ছিলেন তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের মেধা, পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছেঁড়া জুতা পরে চলেছেন, কারণ নতুন জুতা কেনার টাকা ছিল না। সেই ছেলেই একদিন পরিবারের স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন।
তার চাকরি পাওয়ার পর বদলে যেতে শুরু করেছিল পরিবারের ভাগ্য। ভাঙা সংসার গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু এক কালরাতে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল।
বুলেটকে পাওয়া গেল মহাসড়কের পাশে নিথর, রক্তাক্ত অবস্থায়। স্বপ্ন, সংগ্রাম আর সাফল্যের এক জীবন থেমে গেল নির্মমভাবে। রাস্তার ধারে পড়ে ছিল শুধু একটি দেহ নয়, পড়ে ছিল অনেক স্বপ্নের সমাধি।
পাঁচজনকে গ্রেপ্তার,স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি:
এ ঘটনায় র্যাব কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন মো. সোহাগ, মো. সুজন, এমরান হোসেন ওরফে হৃদয়, রাহাত হোসেন ওরফে জুয়েল এবং ইসমাইল হোসেন ওরফে জনি। তাঁদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বুলেট বৈরাগীর লুণ্ঠিত মালামাল এবং তার মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার পাঁচ আসামির মধ্যে চারজন—সোহাগ, এমরান, রাহাত ও সুজন—আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর আসামি ইসমাইল হোসেন জনির তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।
বুলেটের বাবা, মা এবং স্বজনদের একটাই দাবি—অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
বুলেটকে হারিয়ে বাবা-মায়ের বুকে অনন্ত আগুন
সন্তান হারানোর শোকের কোনো ভাষা নেই, কোনো সান্ত্বনাও নেই। যে ছেলের জন্য বাবা জমি বিক্রি করেছেন, মা অশ্রু লুকিয়েছেন, সেই ছেলেকে হারিয়ে আজ তাঁদের পৃথিবী শূন্য।
এই আগুন দাহের আগুন নয়, এটি বুকের ভেতর সারাজীবন জ্বলে থাকা আগুন।
বুলেট বৈরাগীর মা নীলিমা বৈরাগী এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না, তার সোনার ছেলে আর ফিরবে না।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্টে ছেলেটাকে মানুষ করেছি। ওর বাবা জমি বিক্রি করেছে, অন্যের জমিতে কাজ করেছে। আমার সোনার ছেলে এভাবে চলে গেল কেন?’
শুক্রবার রাতের সেই ফোনকল আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। ভোরের দিকে ছেলের নম্বরে ফোন করলে অপর প্রান্ত থেকে কেউ বলেছিল, ‘ঘুমাইতেছি, আরেকটু পরে আইতেছি।’ তখনই মায়ের মনে হয়েছিল, কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছে।
‘আমার ছেলের ভাষা এটা না’—মায়ের সেই আশঙ্কাই হলো সত্য
রাতের ফোনে অপর প্রান্তের কণ্ঠ শুনেই কেঁপে উঠেছিল মায়ের মন। মায়ের হৃদয় বুঝে গিয়েছিল, কিছু একটা ভয়ংকর ঘটেছে। সেই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত নির্মম সত্য হয়ে সামনে এলো। একজন মায়ের অন্তর্দৃষ্টি হার মানল না, হার মানল পৃথিবীর সব সান্ত্বনা।
ছেলের জন্মদিনে কেক কাটার স্বপ্ন, তার আগেই বাবার কফিন
স্ত্রী উর্মি হীরার চোখে এখন শুধুই শূন্যতা। ২০২২ সালের ২২ এপ্রিল বুলেট ও উর্মির বিয়ে হয়। গত বুধবারই ছিল তাদের চতুর্থ বিবাহবার্ষিকী। প্রশিক্ষণে থাকায় একসঙ্গে উদযাপন করতে পারেননি।
তাই ছেলে অব্যয়ের প্রথম জন্মদিন আর বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে তড়িঘড়ি করে কুমিল্লায় ফিরছিলেন বুলেট। একটি বড় কেক, কিছু ছবি আর পরিবারের হাসিমাখা মুহূর্ত—এমনই ছিল বুলেটের স্বপ্ন।
একমাত্র ছেলের প্রথম জন্মদিন ঘিরে ছিল কত পরিকল্পনা, কত আনন্দের অপেক্ষা। কিন্তু জন্মদিনের আগেই ঘরে এলো বাবার নিথর দেহ। উৎসবের ঘর মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকের ঘরে।
অব্যয়ের প্রথম জন্মদিনে সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি—তার বাবা
এক বছর পূর্ণ হলো ছোট্ট অব্যয়ের জীবনের। কিন্তু তার প্রথম জন্মদিনে পাশে নেই সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি। যে বাবা তাকে কোলে নিয়ে কেক কাটার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাবাই আজ শুধুই স্মৃতি, আকাশের দূর নক্ষত্র।
পরিকল্পনা ছিল অনেক। জন্মদিনে বড় কেক কাটা হবে, ছবি তোলা হবে, প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতিতে ধরে রাখা হবে। কিন্তু জন্মদিনের আগেই বাবাকে হারাল ছোট্ট অব্যয়।
এখনও সে বুঝে উঠতে পারেনি, তার বাবা আর কোনোদিন ফিরবেন না।
গত রোববার সকালে ঠাকুরমার কোলে বসে সাংবাদিকদের মাইক্রোফোন নিয়ে খেলছিল অব্যয়। তার নিষ্পাপ মুখে হাসি, অথচ চারপাশে কান্না। এই দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে অশ্রুসিক্ত করেছে।
যে গ্রাম চাকরির জন্য দোয়া করেছিল, আজ সেই গ্রাম কাঁদছে বুলেটের জন্য
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ডুমুরিয়া গ্রামের বাড়ি ফিরে পাড়ার কিশোরদের নিয়ে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করতেন বুলেট। গ্রামের সবার প্রিয় ছিলেন তিনি।
একসময় এই গ্রামের মানুষ হাত তুলে প্রার্থনা করেছিলেন বুলেট বৈরাগীর সাফল্যের জন্য। সে ফিরে এসেছে নিথর দেহ হয়ে, কফিনবন্দী হয়ে। পুরো গ্রাম কাঁদছে তার জন্য।
ডুমুরিয়া গ্রামে আজ শুধু হাহাকার আর অবিশ্বাসের দীর্ঘশ্বাস। যে উঠোনে স্বপ্নের গল্প শোনা যেত, সেখানে আজ শোকের নীরবতা।
বুলেটের চাচা বিমল বৈরাগী বলেন, ‘জীবনে কাউকে নখের আঁচড়ও দেয়নি। সেই ছেলেটির লাশ আজ রাস্তার পাশে পড়ে থাকতে হলো।’
দেশ স্তম্ভিত, গ্রাম শোকাহত: বুলেট বৈরাগীর মৃত্যুতে কান্নার ঢেউ
বুলেট বৈরাগীর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। একজন সৎ, মেধাবী ও স্বপ্নবান কর্মকর্তার এমন পরিণতি সবাইকে ব্যথিত করেছে।
ডুমুরিয়া গ্রাম আজ শোকে স্তব্ধ, আর দেশজুড়ে বইছে শোকের ঢেউ। এই মৃত্যু আমাদের শুধু কাঁদায় না, আমাদের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
আজ বুলেট বৈরাগী নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তার স্বপ্ন, তার সংগ্রাম, তার অসমাপ্ত পরিকল্পনা। রয়ে গেছে ছোট্ট অব্যয়ের জন্মদিনের অপূর্ণ কেক, স্ত্রীর অশ্রু, মায়ের আহাজারি, আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের বুকের অনন্ত শূন্যতা।
দাহের আগুন একসময় নিভে যায়। কিন্তু সন্তানহারা মা-বাবার বুকের আগুন কখনো নেভে না।
বুলেট বৈরাগী এখন শুধু একটি নাম নয়; তিনি হয়ে উঠেছেন এক অপূরণীয় শূন্যতার প্রতীক, এক নির্মম বাস্তবতার নাম।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



