মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজের অনিশ্চয়তা ও আমদানিনির্ভরতার চাপে উন্মোচিত হলো দেশের জ্বালানি খাতের দুর্বলতা
প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর আবারও জ্বলেছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)-এর চুল্লি।
সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর শুক্রবার সকাল থেকে ধাপে ধাপে উৎপাদন শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে শুধু উৎপাদন শুরুর খবরেই সীমাবদ্ধ নয় এই ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এবং মাত্র দুটি উৎসের ওপর বাংলাদেশের অতিনির্ভরতা—সব মিলিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার নাজুক বাস্তবতাও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে সাম্প্রতিক এই সংকট।
রিফাইনারি সূত্র জানিয়েছে, গত মার্চের শুরু থেকেই সৌদি আরবের রাসতানুরা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল ধানা বন্দর থেকে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে পৌঁছায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে একের পর এক চালান আটকে যায়।
ফলে দ্রুত কমতে থাকে ইআরএলের মজুত। শেষ পর্যন্ত ১২ এপ্রিলের পর থেকে মূল শোধন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এই সময়ে সীমিত পরিসরে কিছু উৎপাদন চালু থাকলেও তা ছিল প্রায় নামমাত্র। দিনে মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টন পেট্রল ও বিটুমিন উৎপাদন করা হচ্ছিল। এতে বাজারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়।
নতুন চালান পৌঁছানোর পর শুক্রবার থেকেই ‘ক্রুড অয়েল ডিস্টিলেশন ইউনিট’ চালু করা হচ্ছে, যা শোধন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ইউনিটও পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরবে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাত বলেন, “আজ সকাল থেকেই শোধন কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়ানো হবে। আশা করছি, দিনের শেষের দিকে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন শুরু করা যাবে।”
দিনে সাড়ে চার হাজার টন শোধনের সক্ষমতা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইআরএলে দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত তেল শোধন করা যায়। এই পরিমাণ তেল প্রক্রিয়াজাত করা হলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টন ডিজেল উৎপাদন সম্ভব।
এ ছাড়া উৎপাদিত হয়—প্রায় ২০০ টন পেট্রল, প্রায় ১ হাজার ৫০০ টন ফার্নেস অয়েল, প্রায় ২০০ টন বিটুমিন ও ৪০০ থেকে ৬০০ টন ন্যাফথা।
অপরিশোধিত তেলের ধরন ও চাহিদার ভিত্তিতে এই অনুপাত কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে।
চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত এই শোধনাগারে মূলত সৌদি আরবের ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘মারবান ক্রুড অয়েল’ পরিশোধন করা হয়।
এখান থেকে ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস অয়েল, বিটুমিনসহ ১৩ ধরনের পণ্য উৎপাদিত হয়।
সংকটে উন্মোচিত নির্ভরতার ঝুঁকি
রিফাইনারি সূত্র জানায়, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর আগে ইআরএলের মজুতে প্রায় দেড় লাখ টন অপরিশোধিত তেল ছিল।
কিন্তু নতুন চালান না আসায় ধাপে ধাপে সেই মজুত প্রায় শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে কোম্পানিটির মোট মজুত সক্ষমতা মাত্র ২ লাখ ২৫ হাজার টন।
যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ আসে এই শোধনাগার থেকে। ফলে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখন ক্রমেই আমদানি করা পরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে আমদানি করা মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ৭৬ শতাংশই ছিল পরিশোধিত তেল।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন—দুটোরই সরাসরি চাপ পড়ছে দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি ব্যয়ের ওপর।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে যে অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্ভরতা খুব সীমিত কয়েকটি উৎসের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই পুরো সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়ে।
বিকল্প উৎসের খোঁজে ইআরএল
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরুর পর বিকল্প উৎস খুঁজতে শুরু করে ইস্টার্ন রিফাইনারি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরিশোধিত তেলের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে চারটি দেশের তেলকে বাংলাদেশে ‘পরিশোধনযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দেশগুলো হলো—নাইজেরিয়া, মালয়েশিয়া, নরওয়ে, আলজেরিয়া। এসব দেশের ‘বনি ক্রুড’, ‘মালয়েশিয়ান ব্লেন্ড’, ‘আলবেইন ব্লেন্ড’ ও ‘আলজেরি ক্রুড’-এর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এগুলো বিদ্যমান শোধন প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন বিপিসিতে পাঠানো হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। যদিও এখনো সেই চালান দেশে পৌঁছায়নি।
‘সামান্য অস্থিরতায়ও থেমে যাচ্ছে সরবরাহ’
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, “অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মাত্র দুটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য অস্থিরতা তৈরি হলেই সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন তলানিতে নেমে যাচ্ছে। আর এর চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ছে।”
তিনি বলেন, বিকল্প উৎস নিশ্চিত করা, দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী সরবরাহ চুক্তিতে যাওয়া এবং কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই সংকট আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো অত্যন্ত ভঙ্গুর।
দ্বিতীয় শোধনাগার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, বড় পরিসরে মজুত সুবিধা তৈরি এবং বহুমুখী আমদানি উৎস নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



