back to top

করিডোরজুড়ে কান্না, আইসিইউতে জীবনসংগ্রাম: শিশু রেশমার পাশে ডিসি

প্রকাশিত: ০৮ মে, ২০২৬ ১৬:৫১

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ করিডোরে তখন নেমে এসেছে ভারী নীরবতা। ভেতরে লাইফ সাপোর্টে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ১২ বছরের এক শিশু—রেশমা আক্তার।

চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে যাওয়া গুলিতে তার মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কান্নায় ভেঙে পড়া পরিবার। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে শুধু উৎকণ্ঠা আর অসহায় অপেক্ষা।

এই শোকাবহ পরিস্থিতির মধ্যেই হাসপাতালে উপস্থিত হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা প্রটোকল ছাড়াই তিনি সরাসরি চলে যান আইসিইউতে থাকা শিশুটির শয্যার পাশে।

উপস্থিতদের ভাষায়, সেখানে তিনি প্রশাসক হিসেবে নয়, বরং একজন অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়েছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন রৌফাবাদ শহীদ মিনার গলি এলাকায় ৫ থেকে ৬ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী যুবক হাসান ওরফে রাজুকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই হাসানের মৃত্যু হয়।

সেই গুলির মধ্যেই পথচারী হিসেবে আহত হয় শিশু রেশমা আক্তার। পরিবারের জন্য পান আনতে বাসা থেকে বের হয়েছিল সে।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে রাখা হয় লাইফ সাপোর্টে আইসিইউতে।

ঘটনার খবর পেয়ে শুক্রবার (৮ মে) হাসপাতালে যান জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক।

আইসিইউতে গিয়ে তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন এবং নিজে রেশমার সিটি স্ক্যান রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন।

চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গুলি চোখের ভেতর দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এই তথ্য শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেলা প্রশাসক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রেশমার মায়ের কান্না দেখে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি।

পরে পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং তাদের আর্থিক দুরবস্থার কথা জেনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করেন।

চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শিশুটির চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা যেন না হয় এবং সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।

জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, “একজন নিরীহ শিশুর এভাবে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। এটি আমাদের সবাইকে মানবিকভাবে নাড়া দিয়েছে। কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই ছাড় পাবে না।”

তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে কাজ করছে। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে।

চট্টগ্রামে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। অতীতে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের উদাহরণ টেনে বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রেশমার পরিবার সম্পর্কে তিনি জানান, শিশুটির বাবা মো. রিয়াজ আহমেদ একজন প্রতিবন্ধী এবং পান বিক্রি করে পাঁচ সন্তানের সংসার চালান।

এই বিবেচনায় পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

পরবর্তীতে রেশমার অবস্থার অবনতি হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়।

এ সময় জেলা প্রশাসক সরাসরি ফোন করেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীনকে। তিনি দ্রুত আইসিইউ ও জরুরি অপারেশনের ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানান।

একই সঙ্গে রেশমার পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখেন তিনি এবং চিকিৎসার অগ্রগতির খোঁজ নেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বলেন, জেলা প্রশাসক প্রায়ই দরিদ্র রোগীদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ফোন করেন এবং আজও রেশমার চিকিৎসার বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন।

রেশমার ভাই মো. এজাজ হোসেন বলেন, “তিনি শুধু হাসপাতালে এসে দায়িত্ব শেষ করেননি, পরে আবার ফোন করে চিকিৎসার খোঁজ নিয়েছেন। তিনি সত্যিই একজন মানবিক জেলা প্রশাসক।”

একটি প্রশাসনিক পদের ক্ষমতা সাধারণত নীতিনির্ধারণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

কিন্তু এই ঘটনায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উপস্থিতি দেখিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র—যেখানে প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্বও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রক্তাক্ত আইসিইউ করিডোরে দাঁড়িয়ে তিনি হয়তো রেশমার জীবন বাঁচানোর নিশ্চয়তা দিতে পারেননি, তবে আশার আলোটুকু নিভতে দেননি—এই বার্তাই রেখে গেছে তাঁর উপস্থিতি।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি