বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকোমোটিভ কেনাকাটাকে ঘিরে অতীতে একের পর এক দুর্নীতি, অতিমূল্যায়ন ও সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে।
ধারাবাহিকতায় এবার নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে রেলের আরেকটি বড় প্রকল্প। এবার অভিযোগ পাওয়া গেছে, ৩০টি মিটার গেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাত্র দুই বিদেশি প্রকৌশলী নিয়োগে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো. বোরহান উদ্দিন।
অস্বাভাবিক এই ব্যয় শুধু বিস্ময়ই তৈরি করেনি, খোদ পরিকল্পনা কমিশনও এর যৌক্তিকতা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলেছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ—এ ধরনের ব্যয় রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং এর আড়ালে অস্বচ্ছতা কিংবা অনিয়মের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
রেলওয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে, পুরোনো ও জরাজীর্ণ ইঞ্জিন প্রতিস্থাপনে নতুন লোকোমোটিভ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
“বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ৩০টি মিটার গেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ” শীর্ষক প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮২৭ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।
এর মধ্যে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ দেবে ১ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
বাকি ৮২৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বহন করবে সরকার। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
তবে প্রকল্পের মূল ক্রয় পরিকল্পনার চেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নতুন কেনা ৩০টি লোকোমোটিভ পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুজন বিদেশি সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দেওয়া হবে।
আর এই দুজন বিদেশি সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগের জন্য ৪৯ কোটি ৫৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা ব্যয় রাখা হয়েছে।
এত বিপুল ব্যয়ের প্রস্তাব দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দুই বিদেশি প্রকৌশলীর জন্য এত টাকা ব্যয়ের যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না।
একই অর্থে অন্তত ২০ জন দেশীয় প্রকৌশলীকে জার্মানি বা অন্য কোনো উন্নত দেশে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব।
এতে একদিকে দক্ষ দেশীয় জনবল তৈরি হতো, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে রেলখাত বিদেশি নির্ভরতা থেকেও বেরিয়ে আসতে পারত।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের যুগ্মপ্রধান (রেল পরিবহন উইং) মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘একটি প্রস্তাবিত প্রকল্পে দুই প্রকৌশলীর জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয় চাওয়া হয়েছে, এটা অনেক ব্যয়, এটা আমাদের পর্যবেক্ষণে আছে। এতদিন এটা চলে আসছে। এটা আমরা ধরেছি। তবে রেলের মেইনটেন্যান্স করার লোক নেই।’
তিনি বলেন, ‘দরকার হয় বিদেশে ট্রেনিং দিয়ে রেল মেরামতের প্রকৌশলী তৈরি করতে হবে। আমি ২০ জনকে ২০ দিন জার্মানিতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করলে এত টাকা খরচ হবে না।
এতে করে দেশীয় প্রকৌশলী আমাদের অ্যাসেট হবে। এই অ্যাসেট ৩০ বছর দেশকে সাপোর্ট দেবে। এরাই আবার আমাদের অন্যদের শেখাবো।’
এ বিষয়ে রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (লোকো) মো. বোরহান উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা দুজন প্রকৌশলীর ব্যয় ৫০ কোটি টাকা ধরেছি। তবে এটা চাওয়া হয়েছে, রাখার দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশনের।
পরিকল্পনা কমিশন যেভাবে বলবে আমরাও সেভাবে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রস্তুত করবো। এটা নিয়ে সামনে সভা হবে, সেই সভায় সবকিছু বিস্তারিত আলোচনা হবে।
এদিকে কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু বিদেশি প্রকৌশলীদের ব্যয় নয়, পুরো প্রকল্পের ব্যয় কাঠামোতেই অসংগতি রয়েছে।
প্রতিটি লোকোমোটিভের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬৮ কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা (সিডি-ভ্যাটসহ)। এই ব্যয়ের ভিত্তি কী, অতীতে কেনা লোকোমোটিভের সঙ্গে এর তুলনামূলক অবস্থান কোথায়—সেসব তথ্যও চাওয়া হয়েছে রেলওয়ের কাছে।
এ ছাড়া প্রকল্প সমাপ্তির পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য স্পেয়ার পার্টস বাবদ ৪৬৯ কোটি ৫৫ লাখ ৮৬ হাজার টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এত বিপুল অর্থের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোন যন্ত্রাংশ কত প্রয়োজন, তার বাজারদর কত, প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের মূল্য কত—সবকিছুর বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করে এ ধরনের বড় অঙ্কের বরাদ্দ অনুমোদন দেওয়া হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে।
রেলওয়ের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “রেলওয়েতে প্রকল্প মানেই বড় কেনাকাটা, আর বড় কেনাকাটা মানেই বড় ধরনের অনিয়মের সুযোগ। লোকোমোটিভ কেনা থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ—সবখানেই দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। নতুন প্রকল্প মানে অনেকের কাছে নতুন করে অর্থ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হওয়া।”
অতীতেও রেলের লোকোমোটিভ ও যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগে একাধিকবার তদন্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বিভিন্ন সময়ে অতিমূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনা এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে মামলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়মের মাধ্যমে সরকারের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় নতুন এই প্রকল্প ঘিরে আবারও প্রশ্ন উঠছে—রেলের আধুনিকায়নের নামে কি আবারও অস্বচ্ছ ব্যয়ের নতুন খাতা খুলছে? নাকি পুরোনো দুর্নীতির চক্রই নতুন মোড়কে আরও একবার সক্রিয় হচ্ছে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

