চট্টগ্রাম বন্দর জুড়ে ‘সিন্ডিকেট রাজ’: দুই কর্মকর্তার কার্যপরিধি নিয়ে প্রশ্ন!

টেন্ডার আগে রেট ফাঁস, পরে শর্ত বদল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৬ ১১:৫৫

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নৌ-প্রকৌশল বিভাগে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক সিন্ডিকেট। এমন অভিযোগ উঠেছে বিভাগের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

অভিযোগ বলছে, পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারের গোপন রেটকোড আগেভাগে ফাঁস করা, অস্বাভাবিক ও স্ববিরোধী শর্ত জুড়ে দেওয়া, এমনকি দরপত্র বাতিল করে নতুন শর্তে পুনরায় টেন্ডার আহ্বান-এসব কৌশল নিয়মিতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বছরের পর বছর ধরে চলা এই অনিয়মে ক্ষুব্ধ ঠিকাদারদের একাংশ এখন প্রশাসনিক তদন্তের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী (মেরিন) পদে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন এবং জলযান শাখায় অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিন।

ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সরকারি ক্রয়নীতি (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে আসছেন তাঁরা।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওটিএম ও ই-জিপি টেন্ডার পদ্ধতিতে পছন্দের কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গোপনে রেটকোড সরবরাহ করা হয়।

মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আগেই কাজের মূল্যসীমা জেনে যাওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানগুলো নিখুঁত দরপত্র জমা দিয়ে সহজেই কাজ বাগিয়ে নেয়।

অন্যদিকে সাধারণ ঠিকাদাররা পে-অর্ডার, সিডিউল ও অন্যান্য ব্যয় বহন করেও প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না।

তবে অভিযোগ শুধু রেটকোড ফাঁসেই সীমাবদ্ধ নয়। টেন্ডারের শর্ত এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যাতে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা অংশ নিয়েই কার্যত অযোগ্য হয়ে পড়ে।

ছোট কাজের জন্য কঠিন ও অপ্রয়োজনীয় সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও একই ধরনের বড় কাজের ক্ষেত্রে সেই শর্ত রাখা হচ্ছে না।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, স্টোর রেক সম্পাদনের মতো ছোট কাজের জন্য এবিসি সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অথচ বন্দরের আরও বড় উন্নয়ন প্রকল্পেও এ ধরনের সনদ চাওয়া হয়নি।

একইভাবে পল্টুন বার্জ-২০–এর একটি ছোট মেরামতকাজে আইএসও সনদ বাধ্যতামূলক করা হলেও পল্টুন বার্জ-২–এর মেরামতকাজে সেই শর্ত আরোপ করা হয়নি।

একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা গেছে জরিপ স্টিয়ারিং সিস্টেম উইঞ্জ মেরামত ও জরিপ-১০ ইঞ্জিন ওভারহোলিংয়ের কাজেও।

এসব কাজে পিওএমএমডি সার্টিফিকেট ও ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) বাধ্যতামূলক করা হলেও অনেক বড় মেরামতকাজে স্থানীয় ডিলারের পণ্য সরবরাহের সুযোগ দিয়ে এসব শর্তই বাদ রাখা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নৌ-প্রকৌশল বিভাগের প্রায় প্রতিটি দরপত্রেই একই ধরনের অসঙ্গতি দেখা যায়। কাজের ধরন কাছাকাছি হলেও টেন্ডারের শর্তে কোনো সামঞ্জস্য রাখা হয় না। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী শর্ত পরিবর্তন করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়।

এর একটি উদাহরণ হিসেবে ঠিকাদাররা গত বছরের প্লেট সরবরাহ ও গেট বাল্ব সরবরাহসংক্রান্ত একটি টেন্ডারের কথা উল্লেখ করেছেন।

তাঁদের দাবি, পছন্দের ঠিকাদার কাজটি না পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে পুরো দরপত্র বাতিল করা হয়। পরে নতুন শর্ত যুক্ত করে ম্যানুয়াল টেন্ডার আহ্বান করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানকেই কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।

অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়েও কারসাজির অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কার্যাদেশে একক ওয়ার্ক অর্ডারের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ থাকলেও যেসব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে, তাদের সেই অভিজ্ঞতা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। আবার পিপিআরে বাধ্যতামূলক নয়—এমন নথিও ছোট কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে চাওয়া হচ্ছে।

এত অনিয়মের পরও বন্দর কর্তৃপক্ষের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ঠিকাদারেরা। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর উচ্চপর্যায়ে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো তদন্ত হয়নি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহ্বান করা একাধিক টেন্ডারের শর্ত সহজীকরণের দাবিতে কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদনও করেছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী ও বর্তমানে পলাতক কিছু ঠিকাদারকেও নানা কৌশলে কাজ পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টির সত্যতা যাচাইয়ের দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক এবং সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আফছার উদ্দিনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র-এস সময়। পরবর্তীতে বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।

তবে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে ঘিরে ধারাবাহিক এসব অভিযোগ এখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দুদকের সক্রিয় অনুসন্ধান ছাড়া প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে না।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি