চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গার নির্জন এক এলাকায় গভীর রাত। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই, ভেতরে চলছে ভয়ংকর এক কারবার।
ছোট ছোট সুইমিংপুলের মতো চৌবাচ্চায় জমা করা হচ্ছে জেট ফুয়েল। পাশে সারি সারি ড্রাম-কোথাও ডিজেল, কোথাও অকটেন।
বিমানবন্দরে যাওয়ার কথা থাকা একটি ট্যাংকলরি থেকে তেল নামানো হচ্ছিল গোপন সেই আস্তানায়। ঠিক তখনই হানা দেয় কোস্টগার্ড। মুহূর্তেই ফাঁস হয়ে যায় সংঘবদ্ধ জ্বালানি চোরাচালান চক্রের ভয়াবহ তৎপরতা।
গত সোমবার গভীর রাতে পতেঙ্গা থানার ভিআইপি রোডসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল জব্দ করে কোস্টগার্ড আউটপোস্ট পতেঙ্গা।
অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৭ হাজার লিটার জেট ফুয়েল, ৬ হাজার লিটার ডিজেল এবং ১ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন। জব্দ করা হয় তেল পরিবহনে ব্যবহৃত একটি ট্রাকও। উদ্ধার হওয়া তেলের বাজারমূল্য প্রায় ২৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পদ্মা অয়েল পিএলসির ডিপো থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরবরাহের জন্য একটি ট্যাংকলরিতে জেট ফুয়েল নেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই সেটি চলে যায় চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রিত গোপন ডিপোতে। সেখানে চৌবাচ্চা তৈরি করে তেল সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। পাশাপাশি ড্রামে মজুত রাখা হয়েছিল অন্যান্য জ্বালানিও।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোস্টগার্ডের সিগন্যাল কমিউনিকেশন অফিসার লেফটেন্যান্ট হাসিব-উল-ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটকে কেন্দ্র করে অসাধু চক্র যাতে অবৈধভাবে তেল মজুত কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও একই তথ্য নিশ্চিত করেন।
তবে অভিযানের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে চক্রের সদস্যরা পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই একই রাতে নগরের ইপিজেড থানার আকমল আলী জলকপাট এলাকায় আরও একটি অভিযান চালায় কোস্টগার্ড।
সেখানে একটি ঘাটে তল্লাশি চালিয়ে জাহাজ থেকে অবৈধভাবে খালাস করা প্রায় পাঁচ হাজার লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করা হয়। উদ্ধার হওয়া ভোজ্যতেলের বাজারমূল্য প্রায় ৯ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড। এ ক্ষেত্রেও জড়িত ব্যক্তিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
জেট ফুয়েল চুরির চেষ্টার ঘটনায় ইতিমধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পদ্মা অয়েল পিএলসি ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
একই সঙ্গে চারজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপক সোহেল ইদ্রিস, চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা মিল্টন রায়, কর্মী মো. ইদ্রিস এবং ট্যাংকলরির চালক মো. জসিম উদ্দিন।
পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনা জানার পরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোস্টগার্ড কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি তেল চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত।
বিশেষ করে বিমানবন্দরে সরবরাহের জন্য নির্ধারিত জেট ফুয়েল মাঝপথে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের উপস্থিতিকেই সামনে এনেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর ও উপকূলঘেঁষা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই তেল চোরাচালান ও অবৈধ মজুতের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক সক্রিয়।
বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে তেল জব্দ করা হলেও মূল হোতারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
কোস্টগার্ড জানিয়েছে, জ্বালানি ও ভোজ্যতেল চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।
প্রয়োজনে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনি/আরএসপি



