back to top

ফেসবুক প্রেমের ফাঁদে মৃত্যুসম প্রতারণা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জীবন তছনছ!

প্রকাশিত: ২২ মে, ২০২৬ ০৬:২০

ফেসবুকের পর্দায় শুরুটা ছিল নিছকই এক পরিচয়ের গল্প। ধীরে ধীরে সেই সম্পর্ক গড়ায় প্রেমে, তারপর বিয়ের স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিতে।

কিন্তু সেই ‘ভালোবাসার গল্প’ শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় এক ভয়াবহ প্রতারণা, শারীরিক নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইল এবং অর্থ লুটের নৃশংস অধ্যায়ে।

রাজধানীর এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ বছর বয়সী অনার্স তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীর জীবনে এই বিভীষিকা নেমে আসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাসিন্দা ইমতিয়াজ আলমের (২৬) মাধ্যমে।

তিনি নিজেকে ক্রিকেটারের গাড়িচালক পরিচয় দিয়ে ফেসবুকে তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, প্রথমেই সম্পর্ককে প্রেমে রূপ দেন ইমতিয়াজ। এরপর বিয়ের আশ্বাস দিয়ে ধীরে ধীরে তরুণীর আস্থা অর্জন করেন তিনি। সেই আস্থার আড়ালেই তৈরি হয় এক নির্মম প্রতারণার জাল।

হোটেল রুমে বিভীষিকার শুরু :
গত ১৬ জানুয়ারি ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানার জসিমউদ্দিন এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে দেখা করতে ডাকা হয় ওই তরুণীকে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়।

এরপর ৩১ মার্চ ঢাকার রাজলক্ষ্মী এলাকায় আরও একটি হোটেলে ডেকে দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে আবারও একই ঘটনা ঘটে বলে মামলায় উল্লেখ রয়েছে।

সবশেষ ১৭ এপ্রিল একই এলাকার হোটেল সেভেন ভিউয়ের একটি কক্ষে বেলা ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে।

গোপন ভিডিও, ভয় আর ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদ :
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এসব ঘটনার সময় ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপনে ভিডিও ধারণ করা হয়। এরপর সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে চলতে থাকে মানসিক চাপ ও নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া।

এমনকি আত্মীয়-স্বজনের কাছেও ভিডিও পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে। এই ব্ল্যাকমেইলের চাপে ভেঙে পড়েন তরুণী।

৭ লাখ টাকা নিয়ে চট্টগ্রামে, তারপর লুট :
ব্ল্যাকমেইলের চূড়ান্ত ধাপে গত ১৪ মে ঢাকার বাসা থেকে বড় বোনের আলমারি থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন ভুক্তভোগী তরুণী। তার ধারণা ছিল, টাকা দিলে এবং বিয়ে হলে হয়তো এই দুঃস্বপ্ন শেষ হবে।

কিন্তু চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। অভিযুক্ত তাকে কোতোয়ালী থানার স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় নিয়ে গিয়ে কৌশলে—নগদ ৭ লাখ টাকা টাকা, সাথে থাকা প্রায় ২ লাখ টাকা মূল্যের স্বর্ণের চেইন এবং প্রায় ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ।

গ্রেপ্তার, তদন্তে চাঞ্চল্য :
ঘটনার পর মঙ্গলবার (১৯ মে) চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানায় মামলা হয়। ওই দিনই অভিযুক্ত ইমতিয়াজ আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

কোতোয়ালী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আল আমিন জানান, আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং মামলাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

পরিবারের ভাষ্য: “এটা ছিল পরিকল্পিত ফাঁদ”:
ভুক্তভোগীর বড় বোনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত প্রতারণা। অভিযুক্ত নিজেকে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান পরিচয় দিয়ে সম্পর্ক গড়ে তোলে।

গ্রেপ্তারের পর তার মোবাইলে অসংখ্য আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি। এমনকি একটি ভুয়া আইডি খুলে সেসব ভিডিও টাকার বিনিময়ে দেখানো হয়েছে। এমন তথ্যও পরিবারের কাছে এসেছে।

ফেসবুকের ভার্চুয়াল সম্পর্ক কীভাবে বাস্তব জীবনে এক নারীর জীবনকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যেতে পারে—এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।

প্রেমের আড়ালে গড়ে ওঠা এই প্রতারণা শুধু অর্থ লুট নয়, একজন তরুণীর মানসিক ও সামাজিক জীবনকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি