স্বাধীনতার পর যে সম্পদ রাষ্ট্রের হাতে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি প্রভাব, জাল নথি আর প্রশাসনিক যোগসাজশের ছায়ায় পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে থেকে গেছে একটি বহুজাতিক করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে?
বাংলাদেশের করপোরেট ইতিহাসে দীর্ঘদিন চাপা থাকা সেই প্রশ্নই এবার উঠে এসেছে রাষ্ট্রের দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুদকের টেবিলে।
অভিযোগের কেন্দ্রে দেশের অন্যতম বৃহৎ বহুজাতিক তামাক কোম্পানি-ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেড (বিএটিবিসি)।
অভিযোগটি শুধু আর্থিক অনিয়মের নয়, এটি রাষ্ট্রীয় মালিকানা, স্বাধীনতার পর আইনি অধিকার এবং কয়েক দশক ধরে বিদেশে অর্থ প্রবাহের এক বিস্ময়কর বয়ানের দিকে আঙুল তুলছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পাকিস্তান আমলের দুটি তামাক কারখানা স্বাধীনতার পর ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তি’ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কথা থাকলেও জাল কাগজপত্র ও প্রভাব খাটিয়ে তা বহাল রাখা হয় ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর অধীনে।
আর সেই প্রক্রিয়াতেই গত ৫৫ বছরে ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে দুদকে জমা পড়া অভিযোগে।
এই অভিযোগের অনুসন্ধানে নেমে বিএটিবিসি ও যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) কাছে বিস্তৃত নথি তলব করেছে দুদক।
আগামী ১৫ জুনের মধ্যে কোম্পানির নিবন্ধন, মালিকানা, পরিচালনা কাঠামো, শেয়ার বণ্টন, কারখানার তথ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ দলিল জমা দিতে বলা হয়েছে।
দুদকের উপ পরিচালক আকতারুল ইসলাম শনিবার গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানের দায়িত্ব পেয়েছেন দুদকের সহকারী পরিচালক সাজিদ-উর-রোমান। দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই তিনি বাংলাদেশ টোবাকো কোম্পানি, পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানি ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ কোম্পানির নিবন্ধন সংক্রান্ত রেকর্ড তলব করেন।
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিএটিবিসির পরিশোধিত মূলধন ৫৪০ কোটি টাকা।
কোম্পানিটির ৭১ দশমিক ৯১ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে, শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ সরকারের এবং বাকি অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মালিকানায় রয়েছে।
কিন্তু দুদকে জমা পড়া অভিযোগে বলা হয়েছে, এই মালিকানার ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ।
অভিযোগ অনুযায়ী, পাকিস্তান আমেরিকান টোবাকো (পিএটি) ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রামে এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকায় কারখানা স্থাপন করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ওই দুটি কারখানা পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে যাওয়ার কথা ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পিএটির ১৯৭২, ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে তাদের কারখানা হারানোর বিষয়টি উল্লেখ ছিল বলেও দাবি করা হয়েছে অভিযোগে।
এমনকি সেই তথ্য দেখিয়ে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কর ছাড় ও ক্ষতিপূরণও নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু এরপরই ঘটেছে সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ। অভিযোগে বলা হয়েছে, জাল কাগজপত্র তৈরি ও প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় কোম্পানিটিকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত দেখানো হয়।
এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কারখানাসহ পুরো ব্যবসার মালিকানা কার্যত বহাল থাকে ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকোর নিয়ন্ত্রণে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাবেক পাকিস্তান আমেরিকান টোবাকোর এক ফাইন্যান্স ম্যানেজার কয়েকজন মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে এসব নথি তৈরি ও দাখিলে ভূমিকা রাখেন।
আরজেএসসি প্রথমে আপত্তি তুললেও পরে প্রভাবের মুখে সেই নথি গ্রহণে বাধ্য হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত অভিযোগ আড়াল করতে গত কয়েক দশকে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সাবেক সচিবদের কোম্পানির বোর্ডে নিয়োগ বা মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লাভজনক এজেন্সি ব্যবসার সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
অভিযোগে এটিকে “বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং” বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক যেসব নথি চেয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন, আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন, সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন, মালিকানা কাঠামো, পরিচালকদের তালিকা, শেয়ারসংক্রান্ত তথ্য, অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধনের বিবরণ এবং কারখানার তালিকা।
এছাড়া পাকিস্তানের করাচিতে থাকা পাকিস্তান টোবাকো কোম্পানির ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন সংগ্রহের সুপারিশও করা হয়েছে।
এজন্য ইসলামাবাদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও করাচিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অভিযোগে।
দুদকের এই অনুসন্ধান এখন শুধু একটি কোম্পানির আর্থিক লেনদেনের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়, বরং স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং বহুজাতিক করপোরেট প্রভাবের দীর্ঘ ছায়াকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিএটিবিসির বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে শুরুতে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গণমাধ্যমবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ করবে।
পরে বিবৃতি দেওয়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



