রাজীব সেন প্রিন্স : দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আহরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার ঘিরে প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য খালাস, শুল্ক নির্ধারণ ও রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে ও বাইরে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কাস্টম হাউসের বিভিন্ন শাখাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বহিরাগতদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
নতুন করে সামনে এসেছে দীর্ঘ একটি তালিকা, যেখানে বিভিন্ন শাখায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামের পাশাপাশি বহিরাগতদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রভাব খাটানো, ফাইল নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যস্থতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কাস্টম হাউসের প্রায় প্রতিটি শাখাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি অলিখিত সমান্তরাল কাঠামো, যেখানে বহিরাগত ব্যক্তিরা কখনো কম্পিউটার অপারেটর, কখনো নথি সহকারী, কখনো ‘বিশ্বস্ত লোক’, আবার কখনো কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক প্রতিনিধি পরিচয়ে কাজ করছেন। তাদের মাধ্যমেই ঘুষের অর্থ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও লেনদেন হয় বলে অভিযোগ।
‘দালাল’ না ‘স্টাফ’—পার্থক্য করা কঠিন:
অভিযোগে বলা হয়েছে, কাস্টম হাউসের বিভিন্ন শাখায় এমন বহু ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের দেখে সাধারণ সেবাগ্রহীতার পক্ষে বোঝার সুযোগ নেই যে তারা প্রকৃতপক্ষে সরকারি কর্মচারী, নাকি বহিরাগত দালাল।
সেকশন-৯(বি), ৯(এ/সি), ২, ৩, ৪, ৫(এ), ৫(বি), ৬, ৭(এ) ও ৮(এ)–সহ বিভিন্ন শাখায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের নামে ঘুষ সংগ্রহ, ফাইল নিয়ন্ত্রণ, নথি ব্যবস্থাপনা এবং অনানুষ্ঠানিক দরকষাকষির অভিযোগ আনা হয়েছে।
কোন শাখায় কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ:
অভিযোগপত্রে কাস্টম হাউসের বিভিন্ন শাখাকে ঘিরে সক্রিয় একাধিক বহিরাগত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ব্যক্তি বিভিন্ন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ঘনিষ্ঠজন বা অনানুষ্ঠানিক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন এবং তাদের অনেকেই ঘুষ লেনদেন, ফাইল ব্যবস্থাপনা, নথি নিয়ন্ত্রণ কিংবা অফিস-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করেন।
সেকশন-৯(বি): অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদ রাসেল গাজী নিজেকে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন এবং ঘুষ লেনদেনে ভূমিকা রাখেন। একই শাখায় মো. আনোয়ার এআরও ও আরও কর্মকর্তাদের হয়ে অর্থ সংগ্রহ ও লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ মনছুর আলম, মোহাম্মদ সানজু এবং মোহাম্মদ নাজিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফাইল ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ‘চা-নাস্তা খরচ’সহ বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ করা হয়েছে।
সেকশন-৯ (এ/সি) : এই শাখায় মোহাম্মদ জুয়েলের বিরুদ্ধে কম্পিউটার অপারেটর পরিচয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। একই শাখায় মোহাম্মদ ফাহিম এআরও ও আরও কর্মকর্তাদের নামে অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া আবুল হোসেন, মোহাম্মদ রাজু ও মোহাম্মদ আশিকের বিরুদ্ধে নথি, ফোল্ডার এন্ট্রি ও ফাইল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সেকশন-২ : অভিযোগ অনুযায়ী, মাহমুদুল হক সানি ভুয়া কম্পিউটার অপারেটর পরিচয়ে কাজ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে অর্থ সংগ্রহ করেন। একই শাখার মোহাম্মদ আলী আহম্মদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফাইলে ‘নাস্তা খরচ’ উল্লেখ করে অর্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ওমর ফারুকের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে সিল প্রদান এবং অর্থ সংগ্রহে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে এআরও কর্মকর্তাদের নামে অর্থ সংরক্ষণের অভিযোগ রয়েছে।
সেকশন-৩ : অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহাম্মদ আরিফ শুল্ক নির্ধারণ ও মূল্যায়নসংক্রান্ত বিষয়ে প্রভাব খাটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। মোহাম্মদ মিনহাজ বিভিন্ন অফিস কার্যক্রমে সহযোগিতার আড়ালে অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদ মেহেদীর বিরুদ্ধে কম্পিউটার অপারেটর পরিচয়ে কাজ করার পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। একই শাখার আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে নোট, নোটশিট ও প্রশাসনিক কাগজপত্র তৈরির পাশাপাশি অর্থ সংগ্রহে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদ পাভেল কম্পিউটার অপারেটর পরিচয়ে এবং মোহাম্মদ মনি সরাসরি দরকষাকষির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মোহাম্মদ মামুনের বিরুদ্ধে অফিসে নাস্তা সরবরাহের পাশাপাশি অর্থ সংরক্ষণের অভিযোগ রয়েছে।
সেকশন-৪ : অভিযোগকারীদের দাবি, মো. আবু তাহের প্রকাশ টুপি মিজান বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে ঘুষ লেনদেনসংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয় করেন। একই শাখার মোহাম্মদ শাহ আলম এআরও ও আরও কর্মকর্তাদের নামে অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদ সোহাগের বিরুদ্ধে অর্থ লেনদেন ও বিভিন্ন অনিয়মে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। মোহাম্মদ আরমান ভুয়া কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদ শুভ ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে নাস্তা সরবরাহের আড়ালে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ জিরানের বিরুদ্ধে আউটপাস-সংক্রান্ত কার্যক্রমে এবং মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে নথি ও ফোল্ডার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
সেকশন-৬ : মোহাম্মদ পাপ্পুর বিরুদ্ধে ভুয়া কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। রতনের বিরুদ্ধে নথি ও ফোল্ডার এন্ট্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন নাস্তা সরবরাহসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেকশন-৮(এ) : অভিযোগ অনুযায়ী, মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন ভুয়া কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। মোহাম্মদ নোমানের বিরুদ্ধে নথি ও ফাইলপত্র নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগ রয়েছে। আরমান রেজা কর্মকর্তাদের নামে অর্থ সংরক্ষণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। মোহাম্মদ রানার বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ কুদ্দুস বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি অর্থ সংরক্ষণ এবং মোহাম্মদ মঞ্জুর সরাসরি অর্থ গ্রহণের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সেকশন-৫(এ) : মোহাম্মদ রোকনের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালনের অভিযোগ রয়েছে। মোহাম্মদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া মোহাম্মদ সম্রাট, আবুল হাসনাত, মোহাম্মদ বিল্লাল এবং আয়াত (কায়েমের ছেলে)-এর নামও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেকশন-৫(বি) : মোহাম্মদ নাসির ও জুয়েলের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের হয়ে অর্থ লেনদেন ও ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ করা হয়েছে।
সেকশন-৭(এ) : সাইফুল শাহীনের বিরুদ্ধে নথি ও ফোল্ডার ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের হয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। একই শাখায় মোহাম্মদ সুমনের বিরুদ্ধে শুল্কায়ন কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আনা হয়েছে। মোহাম্মদ নাসিরের বিরুদ্ধে কর্মকর্তাদের নামে সংগৃহীত অর্থ নিজের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এভাবে বিভিন্ন শাখাকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ব্যবহার করে একটি সুসংগঠিত দালাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা কাস্টমসের স্বাভাবিক কার্যক্রম, স্বচ্ছতা ও সেবাপ্রাপ্তির পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কাস্টম হাউসে অন্তত ১৫০ জন বহিরাগত দালাল সক্রিয় রয়েছেন। তাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে এমনভাবে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে যুক্ত যে অনেক কর্মকর্তা বদলি হলেও তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে।
তালিকায় থাকা অন্যান্য দালাল ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। পরবর্তী পর্বে উঠে আসবে গাঁ শিউরে উঠার মত চমকপদ সব তথ্য।
‘নাস্তা খরচ’ থেকে কোটি টাকার সাম্রাজ্য:
অভিযোগে উঠে এসেছে একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ—‘নাস্তা খরচ’। অভিযোগকারীদের দাবি, ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি, শুল্কায়নে সুবিধা, নথি প্রক্রিয়াকরণ কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানোর নামে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ লেনদেনকে অনেক ক্ষেত্রে ‘নাস্তা খরচ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, কাস্টম হাউসে প্রতিদিন কয়েক শত কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়। যদিও এই দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে অভিযোগকারীদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনকে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
অভিযোগের মুখে দালালের স্বীকারোক্তিসদৃশ মন্তব্য:
তালিকাভুক্ত দালাল হিসেবে অভিযুক্ত মোহাম্মদ জুয়েল অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, “এরকম তালিকা প্রায়ই হয়ে থাকে, আগামীতেও হবে।
অফিস স্টাফরা না চাইলে আমরা কি কাস্টম হাউসে ঢুকতে পারব? ঘুষ-দুর্নীতি হয়, সেটা দেশের মানুষ জানে।
আমি কাজ না করলে আরেকজন আসবে। ঘুষ কি বন্ধ হবে? তালিকা হতে থাকবে। অফিস স্টাফরা আগে ভালো হয়ে গেলে, দুর্নীতিমুক্ত হলে তখন আর কাউকে এক টাকাও ঘুষ দিতে হবে না।”
জুয়েলের এই বক্তব্য কাস্টম হাউসকে ঘিরে বহুল আলোচিত অভিযোগগুলোর নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
‘স্যাররা এখন সরাসরি টাকা নেন না’:
তালিকায় নাম থাকা মোহাম্মদ রানা নামে পরিচিত, তবে সাইফুল ইসলাম নামে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেন, “আমি এ বছর কাস্টমে কাজ করছি না, আগে করতাম। তালিকায় যারা আছে, তারা সবাই পেশাদার দালাল এবং অনেকেই কাস্টম কর্মকর্তাদের ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করে—এটা সত্য।”
অন্যদিকে তালিকাভুক্ত মোহাম্মদ জিয়ান বলেন, “তালিকায় নাম থাকা নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা স্যারদের হয়ে কাজ করি।
স্যাররা এখন সরাসরি টাকা নেন না, আমাদের মাধ্যমে টাকা-পয়সা লেনদেন করেন। তালিকা প্রকাশ হলেও এ পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে—এমন আশ্বাস আমরা পেয়েছি।”
এই বক্তব্য এবং অভিযোগের গুরুত্বের কারণে এগুলো নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
‘পুরো কাস্টম হাউস চালাই আমরা’ :
অভিযুক্তদের মধ্যে আব্দুর রহিমের বক্তব্য আরও বিস্ময়কর। তিনি বলেন, “পুরো কাস্টম হাউস চালাই আমরা। আমরা সহযোগিতা না করলে অফিস স্টাফরা অফিসও করতে পারবে না।
যদি পারে, আমাদের বাদ দিয়ে অফিস চালিয়ে দেখাক। কাস্টম কর্মকর্তারা অনেকে আইন বোঝেন না। আমরা আছি বলেই অফিসের কাজকর্ম ঠিকমতো হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “কাস্টমে টাকার লেনদেন যুগে যুগে হয়ে আসছে, অনেকটা নিয়মের মতো। এখানে যারা জীবনে একবার চাকরি করে, তারা সবাই গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়ে অন্য জায়গায় বদলি হন। দুদকও জানে, সরকারও জানে।”
‘অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের দিয়ে কাজ করানো হয়’:
তালিকায় নাম থাকা মাহমুদুল হক সানি বলেন, “এখানে যারা কাজ করে তারা সবাই যোগ্য এবং অভিজ্ঞ। তাদের অভিজ্ঞতা এত বেশি যে অনেক সময় অফিসাররা মিটিং করেও কোনো সমাধান দিতে পারেন না। সেখানে আমাদের মতো যারা কাজ করে তারা মুহূর্তের মধ্যে সমাধান দিতে পারে।”
তিনি দাবি করেন, “কাজের প্রয়োজনে অফিসিয়াল কাজের চাপ কমাতে আমাদের মতো লোকজনকে দিয়ে কাজগুলো করা হয়।
তবে যারা জিম্মি করে টাকা নেয় এবং মানুষকে হয়রানি করে, তাদের শাস্তি হোক। কেউ কারও উপকার করে, উপকারের বিনিময়ে খুশি হয়ে কেউ কিছু দিলে এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়।”
অভিযোগকারীদের দাবি: ‘দালালদের ফের অফিসে আনে স্টাফরাই’
অভিযোগকারীদের একজন মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, “কাস্টম হাউসে বহিরাগত দালাল সিন্ডিকেট ও ঘুষ বাণিজ্যে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রায়ই সরকারের পক্ষ থেকে তালিকা করা হয়। আমরা নিজেরাও অনেকবার অভিযোগ আকারে তালিকা কাস্টমস কমিশনার থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় জমা দিয়েছি।”
তার অভিযোগ, “দালালরা কয়েকদিন নিরব থাকলেও অফিস স্টাফরা তাদের আবার অফিসে নিয়ে আসেন। অনেক কর্মকর্তা আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমেও ঘুষের টাকা লেনদেন করেন।”
তিনি বলেন, “কাস্টম হাউস দুর্নীতিমুক্ত ও ঘুষমুক্ত হলে এ দেশ থেকে ৯০ শতাংশ অনিয়ম-দুর্নীতি দূর হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।”
অভিযোগদাতাদের আরেকজন মোহাম্মদ নাছির বলেন, “আমরা চেয়েছিলাম বৈধভাবে শ্রমের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করতে এবং দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে সহযোগিতা করতে।
এখনো বহিরাগত দালালরা অফিস স্টাফদের সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থ উপার্জন করছে। অনেক দালাল কর্মকর্তার পরিচয়ে বসে থাকে। তাদের দেখলে কর্মকর্তা না দালাল—তা বোঝা কঠিন।”
যুগ্ম কমিশনার যা বললেন:
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার মুহাম্মদ সৈয়দুল আলম গণমাধ্যমকে বলেন, “আমার জানামতে কাস্টম হাউস ঘিরে দালালদের যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছিল, তা কিছুটা কমে গেছে বলে আমি মনে করি। পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”সূত্র: ডিসাঙ্গু
তিনি আরও বলেন, “দালাল এবং কাস্টমসের সার্বিক বিষয়ে আমাদের শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন কথা বলেন। বিষয়টি তিনি দেখভাল করে থাকেন। অফিসের মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্বে রয়েছেন তিনি।”
মুখপাত্রের বক্তব্য:
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র ও অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, “বহিরাগতদের সঙ্গে সিএন্ডএফ এজেন্ট ও ব্যবসায়ীদের সম্পর্ক থাকতে পারে।
কেউ অফিসিয়াল কাজে অফিসে এলে তাকে আসতে নিষেধ করার সুযোগ নেই। তবে অফিস স্টাফদের সঙ্গে তাদের সখ্যতা বা আন্তরিক সম্পর্ক থাকতে পারে।”
তবে কর্মকর্তাদের হয়ে বহিরাগতরা ঘুষের অর্থ লেনদেনের নিরাপদ মাধ্যম বা ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করেন—এমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
অভিযোগ, অভিযান, কিন্তু পরিবর্তন কোথায়?
অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেও মূল কাঠামো অক্ষত রয়েছে।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর কাস্টম হাউস চট্টগ্রামের কমিশনারের কাছে যৌথভাবে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং দায় নিরূপণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
তবে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, অভিযুক্তদের বক্তব্য এবং প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনছে—
দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে যে ‘সমান্তরাল ব্যবস্থা’র অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে ঘুরে ফিরে আসছে, সেটি কি কেবল গুজব, নাকি রাষ্ট্রীয় নজরদারির আড়ালে বেড়ে ওঠা এক অদৃশ্য শক্তির বাস্তব প্রতিচ্ছবি?
সেই উত্তর খুঁজছে ব্যবসায়ী সমাজ, সেবাগ্রহীতা এবং রাষ্ট্র।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

