back to top

কাদের অর্থে টিকে আছে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেটওয়ার্ক?

প্রকাশিত: ০৭ জুন, ২০২৬ ১০:৫৮

চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একের পর এক ঝটিকা মিছিল, গ্রেপ্তার অভিযান এবং কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র, গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হলেও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক এখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।

গেল সোমবার নগরীর জিইসি মোড় এবং বুধবার অক্সিজেন এলাকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বড় দুটি ঝটিকা মিছিলের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। পুলিশের অভিযানে ৬৮ জন গ্রেপ্তার হওয়ার পর তদন্তকারীদের সামনে উঠে আসে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

বিশেষ করে কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের পিসি কার্ডে অর্থ জমা, গ্রেপ্তারের পর পরিবারকে সহায়তা এবং মামলার ব্যয় বহনের অভিযোগ তদন্তকে নতুন দিকে নিয়ে যায়।

সিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) আমিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে অর্থায়নের উৎস, কারাগারে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং মিছিল সংগঠনের নেপথ্যের সমন্বয়কারীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই নাম প্রকাশ করা না হলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সম্ভাব্য কয়েকটি নাম আলোচনায় এসেছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, চিহ্নিত কোনো নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার পিসি কার্ডে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ জমা হচ্ছে। অর্থ শেষ হওয়ার আগেই পুনরায় টাকা জমা দেওয়ার ঘটনাও নজরে এসেছে।

শুধু তাই নয়, বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের আগে অনেক বন্দির পিসি কার্ডে একই পরিমাণ অর্থ জমা হওয়ার তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে।

প্রশ্ন উঠছে—এই অর্থ কোথা থেকে আসছে?
জাতীয় একটি দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নজরদারিতে থাকা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম কেএসআরএম গ্রুপের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাত।

একই প্রতিবেদনে সমতা শিপিংয়ের মালিক আজিজুর রহমান, ওয়েল গ্রুপের মালিক ও সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম, এশিয়ান গ্রুপের পরিচালক সাকিফ আহমেদ সালাম, বনফুল গ্রুপের এম এ মোতালেব এবং স্মার্ট গ্রুপের মজিবুর রহমানের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র-আমারদেশ

তবে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—তদন্তাধীন কোনো ব্যক্তির নাম প্রকাশ পাওয়া মানেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। আইনগতভাবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাই নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।

তবুও আলোচনার কেন্দ্রে সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে শাহরিয়ার জাহান রাহাতের নাম। কারণ দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটির শীর্ষ পর্যায়ের এই কর্মকর্তা সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে ব্যবসায়িক পরিসরে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই প্রেক্ষাপটেই বর্তমান তদন্তে তার নাম উঠে আসা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে।

তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা এখন অর্থের প্রবাহ, ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন, কারাগারে অর্থ জমা দেওয়ার প্যাটার্ন এবং সম্ভাব্য সমন্বয়কারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন।

বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে সেইসব ব্যক্তিদের ওপর, যাদের বিরুদ্ধে সংগঠনের আর্থিক সহায়তার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি কেবল কয়েকটি ঝটিকা মিছিলের প্রশ্ন নয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্পর্কের অনুসন্ধান।

যদি অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে সেটি দেখাবে কীভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও কিছু নেটওয়ার্ক আর্থিকভাবে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে।

আর যদি অভিযোগের প্রমাণ না মেলে, তাহলে আলোচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে।

এদিকে কারাগারে থাকা নেতাকর্মীদের পিসি কার্ডে অর্থ জমার বিষয়টি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কারণ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, কোনো সংগঠনের প্রকৃত সাংগঠনিক সক্ষমতা বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তার অর্থের উৎস ও ব্যয়ের ধারা অনুসন্ধান করা।

চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তাই একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে প্রশাসন, রাজনীতি ও ব্যবসায়িক অঙ্গনকে—নিষিদ্ধ সংগঠনের অর্থের সাপ্লাই চেইন কি এখনো সক্রিয়? যদি সক্রিয় হয়, তাহলে সেই নেটওয়ার্কের পেছনে কারা?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন তদন্তকারীদের নজর শাহরিয়ার জাহান রাহাতসহ আলোচনায় থাকা একাধিক ব্যবসায়ীর দিকে।

তবে শেষ পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্তের ফলাফল এবং বিচারিক প্রক্রিয়া।

এ বিষয়ে কেএসআরএম গ্রুপের ডিএমডি শাহরিয়ার জাহান রাহাতের প্রতিক্রিয়া জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটি থেকে কোন বক্তব্য পাঠালে তা প্রকাশ করা হবে।

এদিকে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান। তার মতে, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো পূর্ববর্তী রাজনৈতিক শক্তির অনুগত কিছু ব্যক্তি সক্রিয় থাকতে পারে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলাকে জটিল করে তুলছে।

তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনগুলোর সাম্প্রতিক ঝটিকা তৎপরতা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত জনসাধারণের প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে তারা বড় ধরনের কোনো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

তবে এসব তৎপরতা যদি সময়মতো নিয়ন্ত্রণে আনা না যায় এবং অর্থায়ন ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের উৎস শনাক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

তার ভাষায়, “যেকোনো নিষিদ্ধ বা চরমপন্থী রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু মাঠের কর্মসূচি নয়, এর পেছনের অর্থায়ন, সংগঠন ও সমন্বয় কাঠামোকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। অন্যথায় সমস্যার মূল উৎস অক্ষত থেকে যাবে।”