পাহাড়, নদী, সমুদ্র আর সবুজের শহর চট্টগ্রাম। প্রকৃতি যেন উদার হাতে সাজিয়েছে নগরটিকে।
কিন্তু দ্রুত নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।
এমন বাস্তবতায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) উদ্যোগে শুরু হওয়া মাসব্যাপী বৃক্ষ পরিচর্যা কর্মসূচি নতুন করে আলোচনায় এনেছে নগরীর সবুজায়নের প্রশ্নকে।
কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন শুধু বৃক্ষরোপণের আহ্বানই জানাননি, তুলে ধরেছেন একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ নগর গড়ার বিস্তৃত রূপরেখাও। তাঁর ঘোষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রাম নগরীতে ১০ লাখ গাছ রোপণের কর্মসূচি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র বলেন, “গাছ আমাদের পরম বন্ধু। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, ফল দেয়, কাঠ দেয়, ওষুধ দেয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমরা গাছ থেকে শুধু নিতে জানি, গাছের পরিচর্যা করতে চাই না।”
তাঁর মতে, শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; গাছকে বাঁচিয়ে রাখা এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সুস্থ গাছ বহু বছর ধরে মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যায়।
করোনা মহামারির অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে মেয়র বলেন, সংকটের সেই সময়ে মানুষ নতুনভাবে অক্সিজেনের মূল্য উপলব্ধি করেছে। প্রকৃতির সবচেয়ে বড় অক্সিজেন কারখানা হচ্ছে গাছ।
তাই পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণকে ব্যক্তিগত উদ্যোগের গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির গুরুত্ব উল্লেখ করে মেয়র বলেন, “আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের ঘোষণা দিয়েছেন। এটি একটি দূরদর্শী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।”
তিনি বিশ্বাস করেন, নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
চট্টগ্রামকে ‘ক্লিন, গ্রিন, হেলদি অ্যান্ড সেফ সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য তুলে ধরে ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, কালুরঘাট থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত সড়কের মিড-আইল্যান্ডগুলো ফুল ও সবুজে সাজানো হবে। পাশাপাশি নগরীর খালি জায়গা, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়, নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিচ্ছন্নতা ও উদ্যান বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে মেয়র বলেন, নগরীর নান্দনিকতা ও পরিবেশগত মান অনেকাংশে তাঁদের শ্রম, পরিকল্পনা ও আন্তরিকতার ওপর নির্ভরশীল। ফুল, ফল ও ঔষধি গাছের সমন্বিত রোপণ চট্টগ্রামকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে পারে।
চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মেয়র বলেন, “চট্টগ্রাম প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরপুর একটি নগরী।
এখানে সমুদ্র, পাহাড়, নদী, খাল, উপত্যকা ও জলাশয় রয়েছে। আল্লাহ আমাদের অনেক সম্পদ দিয়েছেন। কিন্তু এসব সম্পদের যথাযথ পরিচর্যা ও সংরক্ষণ করতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
নগর পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে কর্ণফুলী ও হালদা নদী, খাল এবং জলাশয় সংরক্ষণের বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন তিনি।
তাঁর মতে, যত্রতত্র প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণ যেমন বাড়ছে, তেমনি সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। এসব বর্জ্য শেষ পর্যন্ত খাল-নদীতে গিয়ে জমা হয়ে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসের ঝুঁকির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন মেয়র।
তিনি নাগরিকদের নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজেদের উদ্যোগে আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি স্বাস্থ্যকর নগর গড়ে তোলা সম্ভব।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরে মেয়র বলেন, “প্রকৃতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে প্রকৃতিও তার প্রতিক্রিয়া দেখাবে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় তাঁর এই বক্তব্য পরিবেশবিদদের দীর্ঘদিনের সতর্কবার্তার সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।
বক্তব্যের শেষাংশে ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই গাছের গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
বলেন, বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের কাজ নয়, এটি একটি মহৎ ও সওয়াবের কাজও। একটি গাছ যতদিন বেঁচে থাকে, ততদিন মানুষ, প্রাণিকুল ও প্রকৃতির উপকার করে যায়।
মাসব্যাপী বৃক্ষ পরিচর্যা কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামে নতুন এক সবুজায়ন অভিযানের সূচনা হলো।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরীর বিভিন্ন জোনে পর্যায়ক্রমে বৃক্ষরোপণ, পরিচর্যা ও সবুজায়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শুধু নগরীর সৌন্দর্যই বাড়বে না, জলবায়ু সহনশীল ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ার পথও আরও সুগম হবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

