“প্রকল্প শেষ হতে ১০ বছর, ব্যয় বাড়ে কয়েক হাজার কোটি টাকা—কিন্তু দায়ী একজন কর্মকর্তারও শাস্তির নজির নেই। এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: উন্নয়ন হচ্ছে, নাকি দায়হীনতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ?”
চট্টগ্রামে উন্নয়নের গল্প যত বড় হয়েছে, তত বড় হয়েছে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও। প্রকল্পের পর প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, শত শত কোটি টাকা থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন হয়েছে, উদ্বোধনের প্রতিশ্রুতি এসেছে বারবার।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে সময় গেছে, ব্যয় বেড়েছে, নাগরিক দুর্ভোগ দীর্ঘ হয়েছে; অথচ দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি আজও অধরাই রয়ে গেছে।
আরও পড়ুন
প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের নামে জনগণের টাকায় পরিচালিত এসব মেগা প্রকল্পে আসলে কী ঘটেছে?
কেন একটি প্রকল্প বারবার সংশোধন করতে হয়? কেন একই প্রকল্পে একাধিকবার ব্যয় বৃদ্ধি করতে হয়? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে হাজার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, তার দায় কে নেবে?
চট্টগ্রামের আলোচিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প এর সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। পরে সংশোধনের পর সেই ব্যয় ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।
যদিও শেষ পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকা প্রকল্প উদ্বোধন হয়েছে ২০২৩ সালের নভেম্বরে—অর্থাৎ এক দশক পরে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কোনো প্রকল্পের ব্যয় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়া শুধু আর্থিক দুর্বলতার বিষয় নয়; এটি পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহির প্রশ্নও তৈরি করে।
কারণ প্রকল্পের প্রতিটি অতিরিক্ত টাকা আসে জনগণের কর, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব অথবা দেশি-বিদেশি ঋণ থেকে।
একইভাবে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেল প্রকল্পও ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির আলোচনায় এসেছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০১৫ সালের নভেম্বরে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
পরে ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা করা হয় এবং মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
পরবর্তীতে প্রকল্পের সময়সীমা আরও বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে যুক্ত হয় আরও প্রায় ১৬৪ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণ এবং প্রযুক্তিগত জটিলতা ব্যয় বৃদ্ধির কারণ।
কিন্তু উন্নয়ন বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, প্রকল্প গ্রহণের সময় এসব ঝুঁকি কি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি? যদি নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এত বড় বিচ্যুতি কেন?
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের চিত্রও কম উদ্বেগজনক নয়। বছরের পর বছর খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ, খাল পুনরুদ্ধার ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চললেও বর্ষা এলেই নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে পড়তে হয়।
একাধিক সংস্থা একই এলাকায় কাজ করছে, কিন্তু সমন্বয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো ‘দায়হীনতার সংস্কৃতি’।
একটি প্রকল্প পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও যদি তা ১০ বা ১২ বছর ধরে চলে, তাহলে প্রকল্প পরিচালক, তদারক কর্মকর্তা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কিংবা ঠিকাদার—কারও বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা খুব কমই দেখা যায়।
ফলে ব্যর্থতার কোনো মূল্য দিতে হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবারও নতুন প্রকল্পের দায়িত্ব পেয়ে যায়।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পরিকল্পনা কমিশন এবং মহাহিসাব নিরীক্ষকের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে অতীতে দেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্পে অনিয়ম, অতিমূল্যায়ন, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, ক্রয় প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি এবং নিম্নমানের কাজের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
চট্টগ্রামের কয়েকটি প্রকল্প নিয়েও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া জনসম্মুখে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়নি।
এ কারণেই নাগরিক সমাজের প্রশ্ন—প্রকল্পে ব্যয় বাড়লেই কি সেটি স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া হবে? নাকি প্রতিটি অতিরিক্ত টাকার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে?
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) মহাসচিব এডভোকেট এ.এম. জিয়া হাবীব আহসান বলেন, “সময়মতো কাজ শেষ না করতে পারলে দায় ঠিকাদারের ওপর বর্তায়।
কিন্তু বাস্তবে সেই ব্যর্থতার বোঝা বহন করতে হয় জনগণকে। এতে নাগরিক ভোগান্তি যেমন বাড়ে, তেমনি রাষ্ট্রের অর্থও অপচয় হয়।”
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, নকশা পরিবর্তন এবং কিছু কর্মকর্তার অদক্ষতার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো—ব্যবস্থা কোথায়? একটি প্রকল্পে যদি হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়, বছরের পর বছর সময় বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায় কার?
কোন কর্মকর্তা ভুল পরিকল্পনা করেছিলেন? কোন পরামর্শক ভুল হিসাব দিয়েছিলেন? কোন ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছিল? জনগণ কি কখনও সেই তালিকা দেখতে পেরেছে?
বিশ্বের অনেক দেশে নির্ধারিত সময় ও ব্যয় অতিক্রম করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে জরিমানা, চুক্তি বাতিল কিংবা কালো তালিকাভুক্তির মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও একই ধরনের কঠোর জবাবদিহিমূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হচ্ছে।
কারণ উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু উন্নয়নের নামে যদি ব্যয় বৃদ্ধি, সময় বৃদ্ধি, দায়হীনতা এবং অপচয়ই নিয়মে পরিণত হয়, তাহলে জনগণের মনে প্রশ্ন জাগবেই—এটি কি সত্যিই উন্নয়ন, নাকি উন্নয়নের আড়ালে অর্থ অপচয়ের এক অন্তহীন চক্র?
চট্টগ্রামের মানুষ এখন শুধু নতুন প্রকল্পের ঘোষণা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়, অতীতের প্রকল্পগুলোর হিসাব কোথায়? বাড়তি ব্যয়ের জবাবদিহি কোথায়? আর জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের প্রতিটি টাকার দায় নেবে কে?
কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল নতুন অবকাঠামো নয়; বরং সময়মতো, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন। সেই জায়গায় ব্যর্থতা থাকলে মেগা প্রকল্পের সাফল্যের গল্পও প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।
উল্লেখ্য : সংশ্লিষ্ট প্রকল্প এবং বর্তমানে চলমান বিভিন্ন মেগা প্রকল্পকে ঘিরে একাধিক গুরুতর অভিযোগের তথ্য-উপাত্ত প্রতিবেদকের হাতে পৌঁছেছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করা কিছু প্রকল্প পরিচালক, তদারক কর্মকর্তা, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের একটি প্রভাবশালী চক্র রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও তাদের পুরোনো কৌশল বদলায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, কারসাজি ও প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এই সিন্ডিকেট এখনো শত শত কোটি টাকার সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে কীভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হচ্ছে, কারা সুবিধাভোগী, কারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে—তা নিয়ে চলছে বিস্তৃত অনুসন্ধান।
এই চক্রের কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, আর্থিক অনিয়মের ধরন এবং নেপথ্যের যোগসাজশ নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একে একে উন্মোচিত হবে বহু অজানা তথ্য।
যা সামনে আসতে যাচ্ছে, তা শুধু চাঞ্চল্যকরই নয়—অনেকের জন্য হতে পারে অস্বস্তিকর এবং জবাবদিহিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
চোখ রাখুন আমাদের চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেইজে। শিগগিরই প্রকাশিত হবে অনুসন্ধানী পর্ব। মুখোশ উন্মোচনের সেই ধারাবাহিক শুরু হতে যাচ্ছে খুব শিগগিরই।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

