জানাজার মুহূর্তে কাফনের রক্তের দাগে নতুন সন্দেহ, মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা

পরিবারের দাবি স্বাভাবিক, স্বজনদের অভিযোগে তদন্ত শুরু

প্রকাশিত: ০৮ জুন, ২০২৬ ১৩:৩৮

সবকিছুই ছিল শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত। কবর খোঁড়া শেষ। স্বজনরা জড়ো হয়েছেন। গ্রামের মানুষ অপেক্ষা করছেন জানাজার নামাজের জন্য।

শোকাহত পরিবেশে কেউ শেষবারের মতো মৃত ব্যক্তির মুখ দেখছিলেন, কেউ আবার দাফনের প্রস্তুতি সামলাচ্ছিলেন।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা। খাটিয়ায় তোলার সময় কাফনের কাপড়ে চোখে পড়ে রক্তের দাগ।

প্রথমে কয়েকজন বিষয়টি লক্ষ্য করেন। এরপর মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত মানুষের মধ্যে।

শোকের পরিবেশে নেমে আসে কৌতূহল, বিস্ময় আর সন্দেহের মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শুরু হয় ফিসফাস-যে মৃত্যুকে এতক্ষণ স্বাভাবিক বলে জানানো হয়েছিল, সেটি কি সত্যিই স্বাভাবিক?

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্বগুজরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ননা হাজী তালুকদার বাড়িতে রোববার বিকেলে এমন ঘটনাই শেষ পর্যন্ত একটি জানাজা স্থগিত করে দেয়।

মৃত ব্যক্তি সিরাজ উদ্দৌলা দুলাল, প্রয়াত আব্দুস সাত্তারের ছেলে।

শেষ বিদায়ের আয়োজন থেকে তদন্তের সূচনা:
স্থানীয় সূত্র জানায়, নগরীর একটি বাসায় সিরাজ উদ্দৌলার মৃত্যু হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে স্বজনদের জানানো হয়। পরে তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি রাউজানে নিয়ে আসা হয়।

সবকিছুই চলছিল নিয়মমাফিক। আসরের নামাজের পর জানাজা হওয়ার কথা ছিল। এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন। কবরও প্রস্তুত ছিল।

কিন্তু মরদেহ খাটিয়ায় তোলার সময় কাফনের কাপড়ে অতিরিক্ত রক্তের দাগ দেখতে পান কয়েকজন।

সেখান থেকেই শুরু হয় প্রশ্ন। কেন কাফনে রক্ত? রক্তের উৎস কী? মৃত্যুর আগে কি কোনো আঘাত লেগেছিল?
নাকি ঘটনার আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো বাস্তবতা?

এসব প্রশ্নের উত্তর না পেয়েই স্থানীয়রা দাফন কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, কবর প্রস্তুত ছিল এবং জানাজার সব আয়োজনও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু মরদেহ খাটিয়ায় তোলার সময় কাফনের কাপড়ে রক্তের দাগ দেখা গেলে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

একটি জানাজা, যা হওয়ার কথা ছিল কয়েক মিনিটের মধ্যেই, সেটিই পরিণত হয় সম্ভাব্য রহস্যজনক মৃত্যুর অনুসন্ধানের সূচনায়।

স্বজনের অভিযোগ: মাথায় তিনটি কোপের মতো চিহ্ন:
ঘটনার মোড় আরও ঘুরে যায় নিহতের ভগ্নিপতি মো. ইউসূফ বাবুলের বক্তব্যে। তিনি অভিযোগ করেন, সম্প্রতি পারিবারিক কলহের কারণে সিরাজ উদ্দৌলা কিছুদিন আত্মীয়ের বাসায় ছিলেন। পরে তিনি আবার নিজ বাসায় ফিরে যান।

বাবুলের দাবি, মরদেহের মাথায় তিনটি কোপের মতো চিহ্ন রয়েছে। তার প্রশ্ন—যদি মৃত্যু স্বাভাবিক হয়, তাহলে এসব চিহ্ন এল কোথা থেকে?

তিনি মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন। এই অভিযোগ সামনে আসার পর স্থানীয়দের সন্দেহ আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

তবে ঘটনার অন্য একটি ব্যাখ্যাও রয়েছে। নিহতের স্ত্রী জাহেদা বেগম অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছেন, তার স্বামীর মৃত্যু স্বাভাবিকভাবে হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর দুই দিন আগে সিরাজ উদ্দৌলা চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে সামান্য আঘাত পেয়েছিলেন। তার দাবি, ওই আঘাতের বাইরে অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক নেই।

ফলে একই মৃত্যুকে ঘিরে এখন দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বয়ান সামনে এসেছে। একদিকে স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি। অন্যদিকে আঘাত ও কোপের চিহ্নের অভিযোগ।

সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি যতটা আবেগের, তদন্তকারীদের কাছে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ একটি আলামত।

কারণ, মৃত্যুর কারণ নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন দাফনের আগে দেখা যাওয়া প্রতিটি অসঙ্গতিই তদন্তের অংশ হয়ে যায়।

কাফনের কাপড়ে রক্তের দাগ, শরীরের আঘাতের চিহ্ন, স্বজনদের অভিযোগ এবং পারিবারিক কলহের প্রসঙ্গ—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের বিষয়।

তবে তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কেবল রক্তের দাগ বা দৃশ্যমান আঘাত দেখেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

প্রকৃত সত্য নির্ধারণ করবে ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পর্যবেক্ষণ এবং পুলিশের অনুসন্ধান।

খবর পেয়ে রাউজান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে রাতের দিকে মরদেহ উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

রাউজান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাদ্দাম হোসেন জানান, মরদেহের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশের এই বক্তব্যের পর ঘটনাটি আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ, এখন প্রশ্ন শুধু কাফনের রক্তের দাগ নয়; বরং শরীরের আঘাতের চিহ্নগুলোও তদন্তের কেন্দ্রে চলে এসেছে।

এখন যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে সবাই। রাউজানের শান্ত একটি গ্রামের মানুষ এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানতে অপেক্ষা করছেন—

সিরাজ উদ্দৌলা দুলালের প্রকৃত মৃত্যুর কারণ কী? কাফনের কাপড়ে রক্তের দাগ এল কীভাবে? মাথায় তিনটি কোপের মতো চিহ্ন থাকার অভিযোগ কতটা সত্য? শরীরের বিভিন্ন স্থানের আঘাতের উৎস কী? চেয়ার থেকে পড়ে পাওয়া আঘাতই কি এসব চিহ্নের কারণ? নাকি ঘটনার পেছনে রয়েছে অন্য কোনো অজানা বাস্তবতা?

সিরাজ উদ্দৌলা দুলালের শেষ বিদায়ে গ্রামের মানুষ রোববার বিকেলে এসেছিলেন শেষ বিদায় জানাতে। কিন্তু জানাজা আর হলো না। বরং কাফনের কাপড়ে দেখা কয়েক ফোঁটা রক্তই বদলে দিল পুরো দৃশ্যপট।

যে মরদেহ কবরের দিকে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি চলে গেল পুলিশের হেফাজতে। যে মৃত্যু স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, সেটি এখন তদন্তের বিষয়।

আর যে পরিবার শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তারা এখন অপেক্ষা করছে একটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য—

সিরাজ উদ্দৌলা দুলালের মৃত্যু কি সত্যিই স্বাভাবিক ছিল, নাকি কাফনের রক্তের দাগই উন্মোচন করতে যাচ্ছে অন্য কোনো অজানা সত্য?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি