চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
তাঁদের মতে, দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত চট্টগ্রাম বন্দর কোনোভাবেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। জাতীয় স্বার্থে বন্দর পরিচালনা সংক্রান্ত চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
রোববার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় এসব বক্তব্য উঠে আসে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার চুক্তির প্রতিবাদে ‘দেশ বাঁচাও, বন্দর বাঁচাও আন্দোলন’ এই সভার আয়োজন করে।
সভায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর কেবল পণ্য পরিবহনের অবকাঠামো নয়; এটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
তাই বন্দর পরিচালনার বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, বর্তমানে যাঁরা চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। বরং তাঁদের ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন থাকলেও একটি সফল ও লাভজনক দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের করা এই চুক্তি দেশ ও জনস্বার্থে কার্যকর না করার আহ্বান জানান তিনি।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বন্দরসংলগ্ন এলাকায় কৌশলগত ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো অজুহাতেই এই বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তিনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের করা চুক্তিগুলো সংসদে উত্থাপন এবং অংশীজনদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার দাবি জানান।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি দেশের জাতীয় অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাঁর মতে, আগের কর্তৃত্ববাদী সরকার এই প্রক্রিয়া শুরু করলেও পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার তা সম্পন্ন করে। তবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের এসব চুক্তি কার্যকর করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে হওয়া বন্দর পরিচালনা চুক্তি জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
তাঁর দাবি, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে, যার ফলে চট্টগ্রাম বন্দর ভবিষ্যতে কৌশলগত ব্যবহারের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দীন মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় আসা সরকারের দায়িত্ব দেশের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা।
তিনি দেশবিরোধী বলে উল্লেখিত চুক্তিগুলো বাতিল করে সকল অংশীজনকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য সৈয়দ হাসান মারুফ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও এর ভৌগোলিক ও নৌ-প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
জোয়ার-ভাটানির্ভর এই বন্দরে নির্দিষ্ট আকারের চেয়ে বড় জাহাজ প্রবেশ করতে পারে না। উন্নয়নের বড় সুযোগ গভীর সমুদ্রবন্দরে থাকলেও এসব বাস্তবতা বিবেচনায় বর্তমান চুক্তি বাতিল করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।
বিএনপি নেতা রাশেদ খান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অনেক ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ নিয়েছিল এবং বন্দরসংক্রান্ত চুক্তিটিও তাদের সময়েই সম্পন্ন হয়।
এ কারণে বিএনপির ওপর এর দায় বর্তায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এখনো একটি মহল দেশকে পিছিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে ‘দেশ বাঁচাও, বন্দর বাঁচাও আন্দোলন’-এর সভাপতি সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালিত হয়ে আসছে এবং পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী মহলের উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযোগ নেই।
দেশের অন্যতম আয়ের উৎস এই বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার পক্ষে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় স্বার্থে বন্দর পরিচালনা সংক্রান্ত চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানান তিনি।
সভায় আরও বক্তব্য দেন গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী আবুল হাসান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মোমিনুল আমিন।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

