back to top

এক্সপ্রেসওয়ের ‘ক্ষমতার ত্রিভুজ’ ম্যাক্স–মাহফুজ–কাজী সমীকরণে ঘনীভূত বিতর্ক!

চুক্তির বাইরে ১৯৩ কোটি টাকা অনুমোদনে সচিবালয়ে দৌড়-ঝাপ

প্রকাশিত: ০৮ জুন, ২০২৬ ১২:১৩

চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত লালখান বাজার–পতেঙ্গা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি অবকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়েও পরিণত হয়েছে ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত ও অর্থনৈতিক সমীকরণের এক জটিল কেন্দ্রবিন্দুতে।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির ধারাবাহিকতার মধ্যেই এবার সামনে এসেছে চুক্তির বাইরে গিয়ে প্রায় ১৯৩ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ দাবির উদ্যোগ, যা ঘিরে প্রশাসনিক ও প্রকৌশল মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই অর্থ অনুমোদনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সচিবালয় পর্যন্ত চলছে তৎপরতা ও দৌড়ঝাঁপ।

আর এই পুরো সমীকরণের কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছে তিনটি নাম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স, প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান এবং সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস।

সিডিএ’র দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস এবং প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

বিগত সরকারের আমলে এই দুই কর্মকর্তা রাজনৈতিক প্রভাব বা ‘আওয়ামী কার্ড’ ব্যবহার করে বহাল তবিয়তে ছিলেন।

রাজনৈতিক সখ্যতার কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কিংবা অন্যান্য সংস্থার তদন্তের মুখ থেকেও বারবার তারা পার পেয়ে যান।

আর এই প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার রাস্তা তৈরি করা হয়।

৩ বছরের প্রকল্প ৯ বছরে, ব্যয় বেড়েছে ১ হাজার ৪৮ কোটি!
​নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালের জুলাই মাসে যখন মেগা প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়।

তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩ হাজার দুইশত ৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। তখন বলা হয়েছিল, তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে হেঁটেছে।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সিডিএ এবং ম্যাক্স-র‌্যাঙ্কিন যৌথ কোম্পানির মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল।

নথি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে দুই বছর ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপর আরও দফায় দফায় সময় বৃদ্ধি করা হয়। একই সঙ্গে ব্যয়ও বাড়তে থাকে ধারাবাহিকভাবে।

​তবে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না করে প্রথম দফায় ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ দুই বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। পরবর্তীতে সিডিএ’র প্রকৌশলীদের বিশেষ তদবিরে এক লাফে প্রকল্পের ব্যয় আরও ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

ফলে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকার প্রকল্পের বর্তমান ব্যয় দাঁড়িয়েছে চার হাজার দুইশত ৯৮ কোটি টাকায়। একই সঙ্গে কাজের মেয়াদও ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে।

এই ব্যয় বৃদ্ধির ধারা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বাভাবিক অগ্রগতি, নাকি সিদ্ধান্তগত ব্যর্থতার ফলাফল?

সর্বশেষ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চুক্তি বহির্ভূত ‘মূল্য সমন্বয়’ বা প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট নামে অতিরিক্ত প্রায় ১৯৩ কোটি টাকার দাবি।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এই অর্থ অনুমোদনের জন্য প্রশাসনিক পর্যায়ে ফাইল অগ্রসর করা হয়েছে। তবে প্রক্রিয়াটি ঘিরে উঠেছে স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি লঙ্ঘনের প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান চুক্তির কাঠামোর বাইরে গিয়ে এই ধরনের অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হলে তা প্রকল্পের আর্থিক শৃঙ্খলা ও সরকারি ক্রয়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ক্ষমতার ত্রিভুজ: ম্যাক্স–মাহফুজ–কাজী সমীকরণ:
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মহলে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো এক ধরনের অঘোষিত “ক্ষমতার ত্রিভুজ”—যার কেন্দ্রে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স এবং সিডিএর দুই শীর্ষ প্রকৌশলী।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান এবং প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস।

এই দুই কর্মকর্তার প্রশাসনিক ও প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় সুবিধাভোগী হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সের নামও বারবার উঠে আসছে।

তবে সংশ্লিষ্টরা এসব অভিযোগকে “ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর” বলে দাবি করতে পারেন—এমন অবস্থানও রয়েছে প্রশাসনের একাংশে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগ পেয়ে তদন্তের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামাল উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল।

সেই তদন্ত কমিটিকেও ম্যানেজ করে ফেলেন মাহফুজ। ফলে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেননি তদন্ত কমিটি, এমন অভিযোগও করেছেন অনেকে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরও আওয়ামী লীগের দাপুটে প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম থমকে গেছে অদৃশ্য ইশারায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেন।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বিষয়টি আপনারা স্বাধীনভাবে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।

আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে কোনো আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে—এমন ধারণারও ভিত্তি নেই। সর্বোচ্চ তারা একটি বিজ্ঞাপন দিতে পারে।”

সচিবালয়ে ফাইল চলাচল ও ‘প্রভাবশালী তদবির’ প্রশ্ন?
সূত্রের দাবি, অতিরিক্ত অর্থ অনুমোদনের ফাইল সচিবালয়ে অগ্রসর হওয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা হয়েছে। ফাইলটি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনার জন্য ফেরত পাঠানো হলেও পরবর্তীতে তা আবার অগ্রসর হয়।

গণপূর্ত অধিদফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের মূল্য সমন্বয় ভেরিয়েশন করার জন্যে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমান ফাইল জমা দেয়।

শুরুতে গণপূর্ত সচিব কে ফাইলটি তদন্তের জন্যে দেয়। সূত্রমতে, গণপূর্ত সচিব ওই ফাইলটি সিডিএ এর সদস্য জামিলুর রহমান ও সিডিএ প্রধান প্রকৌশলী আনোয়ারুল নজরুল’কে তদন্ত করে ফাইল সাবমিট করার দায়িত্ব দেন। কিন্তু পিডি মাহফুজ অদৃশ্য ক্ষমতাবলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন।

সূত্রের দাবি, পরবর্তীতে ফাইলটিতে পজিটিভ রিপোর্ট দিয়ে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে “সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রী সভা কমিটি” তে প্রেরণ করা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প সময় মতো কাজ শেষ না করে, প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি ‘মূল্য সমন্বয়’ করে প্রকল্পের বরাদ্দের চেয়ে বেশী টাকা পাস করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এ অর্থ ছাড় করিয়ে দিতে প্রকল্প পরিচালক মাহফুজুর রহমানকে সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন সিডিএ’র সদস্য জামিলুর রহমান ও প্রধান প্রকৌশলী আনোয়ারুল নজরুল।

এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ক্রয় ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত কি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত, নাকি এর পেছনে প্রভাবশালী চাপ কাজ করছে?

তদন্ত, অভিযোগ ও অমীমাংসিত প্রশ্ন:
নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী রোড, দেওয়ানহাট থেকে এ.কে খান রোড, সাগরিকা স্টেডিয়াম রোড নির্মাণেও দূর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ক্ষমতাবলে নিয়মবহির্ভূতভাবে পর পর দুটি প্রকল্পের কাজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্সকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তাছাড়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প ঘিরে অতীতেও একাধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অভিযোগের পাহাড় জমলেও তার নিষ্পত্তি হয়নি।

স্থানীয় নাগরিক সমাজ বলছে, এত বড় একটি প্রকল্পে ব্যয় ও সময়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি স্বাভাবিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে না; বরং এটি স্বচ্ছতার ঘাটতির দিকেই ইঙ্গিত করে।

ফলে চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে এখন আর কেবল একটি সড়ক অবকাঠামো প্রকল্প নয়—এটি পরিণত হয়েছে সিদ্ধান্ত, প্রভাব ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের এক জটিল প্রতীকে।

অভিযোগের সত্যতা কতটা, তা নির্ধারণ করবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া।

তবে আপাতত প্রকল্পটি ঘিরে প্রশ্ন একটাই—ব্যয়ের এই লাগামহীন বৃদ্ধি কি স্বাভাবিক, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় কোনো হিসাব?

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন চোখ প্রশাসন, তদন্ত সংস্থা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দিকে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি