পাওনা টাকার বিরোধে অপহরণ, ৫০ লাখ মুক্তিপণ চেয়ে গ্রেপ্তার ৮

জোরারগঞ্জের জঙ্গল থেকে উদ্ধার ব্যবসায়ী, নেপথ্যে অংশীদার!

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:৪৮

ব্যবসায়িক লেনদেন আর মাত্র কয়েক লাখ টাকার পাওনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল দ্বন্দ্ব। কিন্তু সেই পুরোনো বিরোধ যে এত দ্রুত ৫০ লাখ টাকার ভয়ংকর মুক্তিপণ নাটকে রূপ নেবে, তা হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি নগরের শুলকবহর এলাকার গ্যারেজ ব্যবসায়ী মো. হেলাল উদ্দিন (৩৬)।

টানা দুই দিন এক অজানা আতঙ্কের প্রহর গোনার পর অবশেষে মিরসরাইয়ের নির্জন জোরারগঞ্জ মহামায়া লেকের ভেতর বন বিভাগের এক পরিত্যক্ত কটেজ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে তাকে।

আর এই দুর্ধর্ষ অপহরণের নেপথ্যে থাকা তার ব্যবসায়ী অংশীদারসহ মোট আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ।

পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা যায়, হাটহাজারীর বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন পাঁচলাইশের শুলকবহর রওশন বোর্ডিং সংলগ্ন এলাকায় একটি গাড়ির গ্যারেজ পরিচালনা করেন।

তার ব্যবসায়িক অংশীদার মো. আবুল হাশেম (৫২) সেখানে ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এর মধ্যে হেলাল বিভিন্ন সময়ে ৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা পরিশোধ করলেও বাকি ৪ লাখ ৬৯ হাজার টাকা নিয়ে দুজনের মাঝে টানাপোড়েন চলছিল। পাওনা টাকা আদায়ে হাশেম প্রায়ই তাকে হুমকি দিচ্ছিলেন।

গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে করে শুলকবহর রওশন বোর্ডিংয়ের সামনে হাজির হন আবুল হাশেম ও তার ভাড়াটে দল। সেখান থেকেই ভয়ভীতি দেখিয়ে দিনদুপুরে হেলালকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে।

অপহরণের পরদিনই অর্থাৎ ৮ সেপ্টেম্বর সকালে অপহৃত হেলালের মোবাইল ফোন থেকে কল আসে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের কাছে।

ওপাশ থেকে ভেসে আসে ঠান্ডা গলার হুমকি-৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ না দিলে হেলালকে জীবিত ফেরানো হবে না। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করে তাত্ক্ষণিকভাবে অন্তত এক লাখ টাকা পাঠানোর চাপ দেওয়া হয়।

স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে জেসমিন আক্তার দেরি না করে পাঁচলাইশ মডেল থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।

মামলা হওয়ার পরপরই প্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মাঠে নামে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ।

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় আকবরশাহর উত্তর কাট্টলী থেকে প্রথমে শান্ত মিয়া নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তার সূত্র ধরে পাঁচলাইশের মোহাম্মদপুর থেকে গ্রেপ্তার হন মূল পরিকল্পনাকারী আবুল হাশেম। এরপর আকবরশাহর লতিফপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আকরামকে, যার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় হেলালের মোবাইল ফোনটি।

আটককৃত শান্ত ও আকরামকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করতেই বেরিয়ে আসে আসল তথ্য-হেলালকে আটকে রাখা হয়েছে জোরারগঞ্জের মহামায়া লেকের গহীন এলাকার এক পরিত্যক্ত কটেজে!

মুহূর্তের মধ্যে মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানা পুলিশকে সাথে নিয়ে মহামায়া লেক এলাকায় সমন্বিত সাঁড়াশি অভিযান চালায় পাঁচলাইশ পুলিশ। লেকের গভীরের বন বিভাগের পরিত্যক্ত কটেজটি ঘিরে ফেলে তারা।

সেখান থেকে সফলভাবে উদ্ধার করা হয় হাত-পা বাধা হেলালকে। একই সাথে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় পাহারায় থাকা মঈন উদ্দিন রায়হান, আমজাদ হোসেন, মাহবুব রহমান, মানিক হোসেন ও ফারুককে।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অপরাধ স্বীকার করে আসামিরা জানান, মূলত পাওনা টাকা আদায় ও সহজ উপায়ে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেই এই অপহরণের ছক কাটা হয়েছিল।

মূল হোতা আবুল হাশেম ও আকরাম মিলে শান্ত মিয়াকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে অন্যান্য সদস্যদের ভাড়া করেছিলেন।

পাঁচলাইশ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজম্মেল হক নিশ্চিত করেছেন যে, আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৬৫, ৩৮৫, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

দিনদুপুরে ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে নির্জন লেকে আটকে রাখার এই রোমাঞ্চকর ঘটনাটি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী পাড়ায় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

তবে পুলিশের দ্রুত ও চৌকস অভিযানে বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি