একটি সাধারণ কর্মব্যস্ত দিন শেষে প্রতিদিনের মতোই দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরেছিলেন চারজন ব্যবসায়ী। চোখে ছিল আগামীকালের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা, পরিবারকে ঘিরে ছোট ছোট স্বপ্নের জাল।
কিন্তু বুধবার দিবাগত রাতের নিঝুম আঁধার যে তাঁদের জন্য এমন এক নির্মম বাস্তবতা বয়ে আনবে, তা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি কেউ।
রাত ঠিক ১টা ২০ মিনিট। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার উরকিরচর ইউনিয়নের মিয়ারঘাটা এলাকা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। চোখের পলকে চারজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মাথার ওপর থেকে সরে যায় উপার্জনের শেষ সম্বলটুকু।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, একটি দোকানের ভেতরের বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে মুহূর্তের মধ্যে আগুনের তাণ্ডব শুরু হয়। কাঁচামাল ও দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি।
মুহূর্তেই পাশের দোকানগুলোতে একের পর এক থাবা বসায় সেই অগ্নিশিখা। স্থানীয়রা ছুটে এসে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও ততক্ষণে চার-চারটি দোকানের নগদ টাকা, আসবাবপত্র, ফ্রিজ ও মূল্যবান সামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইসমাইল আজিজ ও মাহবুব আলমের দুটি মুদিদোকান পুরোপুরি ভস্মীভূত। ইসমাইল আজিজের দাবি অনুযায়ী, তাঁর একারই ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। আর মাহবুব আলমের দোকান থেকে ছাই হয়ে গেছে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকার মালামাল।
এছাড়া রতনের স্টেশনারি দোকানের বই-খাতা, প্রসাধন ও জরুরি সামগ্রী পুড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং আবদুল বাসেকের টিভি ও ফ্রিজ মেরামতের দোকানটি পুড়ে যাওয়ায় তাঁর লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকায়।
সব মিলিয়ে নিঃস্ব হওয়া এই চার ব্যবসায়ীর দাবি, এক রাতের তাণ্ডবে তাঁদের আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার সম্পদ মাটির সাথে মিশে গেছে।
ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে পড়া ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ইসমাইল আজিজ বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, রাত ১১টার দিকে সব ঠিকঠাক রেখে দোকান বন্ধ করে বাড়ি গিয়েছিলাম। খবর পেয়ে যখন ছুটে আসি, ততক্ষণে আমার সব শেষ। জীবিকার শেষ সম্বলটুকু আর রক্ষা করতে পারলাম না।
সংবাদ পাওয়ার পর কালুরঘাট ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত। তবে সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত ও সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
গ্রামাঞ্চলের হাটবাজারগুলোতে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অপ্রতুল বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে প্রায়শই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে। একটি ছোট শর্ট সার্কিট কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে চার-চারটি পরিবারকে পথে বসিয়ে দিতে পারে, মিয়ারঘাটের এই ঘটনা তারই এক করুণ উদাহরণ।
সরকারের স্থানীয় প্রশাসন এবং বিত্তবানদের সহায়তার পাশাপাশি প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যথাযথ অগ্নি-নির্বাপক ব্যবস্থা ও মানসম্মত ওয়্যারিং নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি-যাতে আর কোনো ইসমাইল, মাহবুব, রতন বা বাসেককে এক রাতে নিঃস্ব হতে না হয়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


