‘আমি একা খাইনি’: লোকমানের স্বীকারোক্তিতে তোলপাড় চট্টগ্রাম এলএ শাখা

জারীকারকের গোপন চুক্তি, অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণে কমিশন ১৫%

নুর মোহাম্মদ রানা: প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:৩৭

সরকারি প্রকল্পের জন্য বাপ-দাদার ভিটেমাটি কিংবা শেষ সম্বলটুকু ছেড়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের টাকা সরকারি তহবিল থেকে স্ব-সম্মানে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার কথা।

কিন্তু চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় গিয়ে সেই টাকা আদায় করা যেন দূরঅস্ত, উল্টো পকেটের টাকা খোয়াতে হচ্ছে ভূমির মালিকদের।

ক্ষতিপূরণের চেক ছাড় করাতে দিতে হচ্ছে সোজা ১৫ শতাংশ ‘কমিশন’। টাকা না দিলে আটকে যায় ফাইল ও চেক, গায়ে চেপে বসে জাল-জালিয়াতির তকমা, আর দিনের পর দিন সরকারি অফিসের বারান্দায় ঘাম ঝরাতে হয় জিম্মি হওয়া মানুষকে।

চট্টগ্রাম এলএ শাখার এই মহাসুসংগঠিত অর্থলুট ও হয়রানির মূলে রয়েছেন দপ্তরটির জারীকারক লোকমান চৌধুরী। যিনি একসময় সামান্য ‘চেইনম্যান’ হিসেবে চাকরি শুরু করে পদোন্নতি পেয়ে জারীকারক হয়েছেন।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারি চাকরির সুযোগকে শতভাগ কাজে লাগিয়ে তিনি ভূমির মালিকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে ঘুষ আদায়ের এক সুদূরপ্রসারী ও অভিনব নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।

অতি সম্প্রতি একটি অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তাঁর এই কায়দা ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা শুনে চোখ কপালে ওঠার জোগাড় খোদ সচেতন মহলের।

আত্মীয়ের বাসায় গোপন ‘অফিস’, নোটিশ জারির সময়ই পাতা হয় জাল

অনুসন্ধানে জানা যায়, পটিয়া উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে নদী রক্ষা ও ভূমি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গৌরালা, নাইখান ও জঙ্গলখাইন মৌজায় জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় এক বছর আগে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জমি অধিগ্রহণের নোটিশ জারির দায়িত্ব পান লোকমান চৌধুরী। তবে সরকারি নোটিশ পৌঁছানোর আড়ালে তিনি মূলত নিজের শিকার খোঁজার কাজটি সারতেন।

ভূমির মালিকদের হাতে ৮ ধারার নোটিশ পৌঁছে দেওয়ার সময়ই তিনি কৌশলে বলে আসতেন, ‘ঝামেলা এড়াতে চাইলে আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করবেন।’

সরকারি দপ্তরের বাইরে পটিয়ায় নিজের এক নিকটাত্মীয়ের একটি ঘরে তিনি গোপনে তৈরি করেন তথাকথিত এক ‘বিকল্প কার্যালয়’।

দাপ্তরিক কাগজপত্র সাজিয়ে সেখানে পুরোপুরি অফিসের আমেজ তৈরি করা হয়। সেখানে এবং পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে নিজ বাসায় ডেকে নিয়ে আসা হতো অসহায় ভূমির মালিকদের।

সেখানেই চলত মূল দরকষাকষি। ক্ষতিপূরণের চেক দ্রুততম সময়ে এবং কোনো ‘ঝামেলা ছাড়া’ ছাড় করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মোট বরাদ্দের ১৫ শতাংশ অর্থ নগদ কমিশন দেওয়ার শর্ত দেওয়া হতো।

এতে রাজি না হলে ফাইল বছরের পর বছর আটকে রাখা হবে বলে ভুক্তভোগীদের পরোক্ষ ভয় দেখানো হতো।

‘আমি একা খাইনি, ১০% দিতে হয় ওপরে’: লোকমানের বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি

সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সব তথ্য-প্রমাণ নিয়ে জারীকারক লোকমান চৌধুরীর মুখোমুখি হলে তিনি কোনো অস্বীকারের পথ বেছে নেননি, বরং যে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেছেন তা এলএ শাখার ভেতরে-বাইরে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে অতি স্বাচ্ছন্দ্যে লোকমান চৌধুরী দাবি করেন, আমি একা টাকা নিইনি বা একা খাইনি। আমার একার পক্ষে কি এত বড় কাজ সম্ভব? ওপরে ঊর্ধ্বতন মহলকে ১০ শতাংশ দিতে হয়। আমি তো সাধারণ এক ছোট কর্মচারী, আমার প্রাপ্তি সামান্যই।

তিনি আরও ফাঁদ উন্মোচন করে জানান, ভূমির মালিকদের তাঁর অফিসে এনে মূলত প্রাথমিক চুক্তিটি করানো হয়। এরপর মাঠে আসল কলকাঠি নাড়েন এলএ শাখার একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী একটি শক্তিশালী সার্ভেয়ার সিন্ডিকেট।

লোকমান একে একে শক্তিশালী সার্ভেয়ার সিন্ডিকেটের অনেকের নাম তথ্য উন্মোচন করেছেন। যা নিয়ে পরবর্তী ধারাবাহিক সিরিজে এক এক করে উন্মোচন হবে সাধারণ মানুষের ন্যায্য টাকার ওপর কমিশন বাণিজ্য করে কিভাবে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।

আমাদের অনুসন্ধানী টিম খুঁজে বের করেছেন এসব সার্ভেয়ারদের সম্পদের উৎস। এখনও চলছে অনিয়ম দুর্ণীতির অনুসন্ধান। সুনিদ্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারী সংস্থা দুদক টিম সাথে নিয়ে শীঘ্রই উন্ম্চেন করা হবে এই চক্রে সরাসরি জড়িত সার্ভেয়ারদের মুখোশ।

লোকমানের ভাষ্য, মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া পর্যন্তই আমার দায়িত্ব। এরপর মূল কাজটা সার্ভেয়াররা সামলান এবং ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত টাকা তারা সরাসরি বুঝে নেন।

শুধু তা-ই নয়, ক্ষতিপূরণ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ‘৮ ধারার নোটিশ’ সহজে পাইয়ে দেওয়ার নামে দপ্তরের নাজিরকে ‘ম্যানেজ’ করতেও মোটা অঙ্কের অর্থ হাতবদল হয় বলে নিশ্চিত করেন এই কর্মচারী।

সার্ভেয়ার সিন্ডিকেটের অশুভ জোট ও দাপ্তরিক অস্বীকার

দীর্ঘদিন ধরে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখাকে ঘিরে একশ্রেণির অসাধু সার্ভেয়ার ও নিম্নপদের কর্মচারীদের অশুভ আঁতাত গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

ভূমির সঠিক সীমানা নির্ধারণ, সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি এবং নথিপত্রের শত ভুলচুক খুঁজে বের করার নাম করে তারা ভূমির মালিকদের মানসিক চাপে রাখেন। আর সেই সুযোগেই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে হাজির হন লোকমান চৌধুরীর মতো জারীকারকেরা।

তবে লোকমান চৌধুরীর এই বিস্ফেোরক বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে দায় এড়িয়ে যান এলএ শাখার নাজির মোয়াজ্জেম হোসেন।

তিনি সরাসরি বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগের কথা আমি প্রথম শুনলাম। কোনো ধরণের অবৈধ অর্থ লেনদেন বা দুর্নীতির সঙ্গে আমি কিংবা আমার দপ্তর যুক্ত নয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নিজের জমি ছেড়ে দিয়ে নাগরিকেরা যখন সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় থাকেন, তখন সরকারি দপ্তরের ভেতরেই এভাবে ‘কমিশন বাণিজ্য’ ও ‘বিকল্প অফিস’ খুলে অর্থ লুটপাটের ঘটনা চরম উদ্বেগজনক।

সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, লোকমান চৌধুরীর স্বীকারোক্তির সূত্র ধরে এই চক্রের মূল হোতা, দায়ী সার্ভেয়ার সিন্ডিকেট এবং নেপথ্যের ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা’দের মুখোশ উন্মোচন করা জরুরি।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অভিনব জালিয়াতি ও অর্থ চুরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে।

(বিশেষ অনুসন্ধানের পরবর্তী পর্বে পড়ুন: চেইনম্যান থেকে লোকমান কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক? সার্ভেয়ার সিন্ডিকেট কমিশন বাণিজ্য করে কিভাবে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন?

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি