back to top

দুই ডিসির বদলি-পদায়নে ষড়যন্ত্র না রোষানল?

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১২:৫৮

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনের মাঠ সাজানোর দায়িত্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। নির্বাচন আয়োজনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়টির অধীনে মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ ডিসিতে একের পর এক রদবদল করছেন সরকার।

অংশ হিসেবে গত রোববার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপ সচিব আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রামসহ তিন জেলার ডিসি পদে রদবদল করার আদেশ আসে।

আদেশ অনুযায়ী চট্টগ্রামের ডিসি পদে কর্মস্থলে যোগদানের জন্য যখন সকল আয়োজন সম্পন্ন, দেশের প্রায় সকল গণমাধ্যমেও নতুন ডিসি আসার সংবাদ প্রকাশ হয়ে গেছে। ঠিক তখনই একটি মহলের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন দাবি করছেন নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও মন্ত্রণালয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম নিলে আব্দুল আউয়ালের চট্টগ্রামে আসা এক প্রকার আটকে যায়।

এক্ষেত্রে ডিসি অফিসের একটি সূত্র বলছে, নতুন ডিসি না আসা পর্যন্ত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে পদায়নকৃত ফরিদা খানমই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক পদে দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

এদিকে অপর এক সুত্র মনে করেন, বদলী ঠেকাতে ডিসি আউয়ালের বিরুদ্ধে একটি স্বাথান্বেষী মহল নানান অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছেন।

তবে গুঞ্জন উঠা সকল অভিযোগ ষড়যন্ত্র দাবি করে সুত্রটি বলেছেন, কন্টাক্ট করে পদায়ন নেওয়ার রেওয়াজে নেই। সংস্কৃতিতে নেই। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিসি পদায়ন হয়েছে।

পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে যারা ভাল কাজ করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তাদের যোগ্যতা অনুসারে জেলা নির্বাচন করে ডিসি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড পরিচালানা করতে গিয়ে মানসিক চাপে রাখতে অসৎ উদ্দেশ্যে ডিসিদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে।

নওগাঁয় কেমন ছিলেন ডিসি আব্দুল আউয়াল :

চট্টগ্রামে ডিসি পদে আব্দুল আওয়ালের নাম প্রজ্ঞাপনে আসার পর অনিয়ম-দুর্ণীতি ও আর্থিক লেনদেনের যেসব অভিযোগ উঠেছে,তা একটু যাচাই করতে নওগাঁর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছেন সিএসপি প্রতিবেদক। দূর্ণীতি নয়, উল্টো প্রশংসার দাবিদার বলে মতপ্রকাশ করেছেন অনেকে।

তারা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর পরিচালক পদে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল। দুদকে দ্বায়িত্ব পালনকালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর নওগাঁ জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হোন তিনি।

দুদকের পরিচালক থেকে প্রথম জেলা প্রশাসক পদে দায়িত্ব গ্রহণের পর নওগাঁর জেলাবাসীকে সর্বোচ্চ সেবা দিতে সবসময় চেষ্টা করেছেন ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় নওগাঁর যে ৯ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের চির স্বরণীয় করে রাখার জন্য ব্যতিক্রমী এক উদ্দ্যেগ গ্রহণ করে প্রশংসা কুঁড়িয়েছিলেন।

নওগাঁ নগরবাসীর মতে, জুলাই আন্দোলনের বীর শহীদদের স্মরণে ডিসি আব্দুল আউয়ালের প্রস্তাবনায় নওগাঁ শহরের মুক্তির মোড় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করা হয়েছিল। যাতে ৫ আগস্ট কি হয়েছিলো, ২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে কারা শহীদ হয়েছিলেন ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের নতুন প্রজন্মের গল্প এই স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে জানতে পারে পুরো নওগাঁবাসী।

তাছাড়া শান্তি ও সম্প্রীতির বিকাশে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সকল স্তরের মানুষকে একসাথে নিয়ে কাজ করার সর্বদা চেষ্টা করেছেন ডিসি আব্দুল আউয়াল। এ ব্যাপারে ডিসি আব্দুল আউয়াল মনে করেন, সুশীল ও উন্নত সমাজ গঠনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।

এছাড়া বিগত এক বছর জেলা প্রশাসক পদে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাত হতে প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য নওগাঁ জেলার প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে এয়ার ফ্লো মেশিন ও মাষকলাইসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বীজ এবং সার বিতরণ করেছেন।

অসহায়দের মাঝে এককালীন অনুদানের চেক ও ঋণের চেক হস্তান্তর, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ভ্যানগাড়ি এবং অসহায় প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইল চেয়ার ও ট্রাই সাইকেল বিতরণ করে জেলাবাসীর প্রচুর ভালবাসা অর্জন করেছেন।

তাছাড়াও জেলায় স্বাস্থ্য সেবার মান বৃদ্ধির কাজ করে গেছেন। দুর্নীতি রোধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের তদারকিও অব্যাহত রেখেছিলেন।

ভাল কাজের ফলস্বরুপ দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ প্রাপ্ত হোন আব্দুল আউয়াল।

তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ হওয়ার পর জনপ্রশাসনেও ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে ২২ কোটি টাকার লেনদেন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী মহলের তদবিরের মতো বিস্ফোরক অভিযোগ এনে ডিসি আব্দুল আউয়ালের বদলী ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে একটি চক্র।

এদিকে একটি জেলার শীর্ষ পদে নিয়োগ নিয়ে এমন নজিরবিহীন আর্থিক লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে প্রশাসনের সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সুশাসন ও স্বচ্ছতা যখন সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত, তখন এমন একটি ঘটনা সরকারের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্তের দাবি তুলেছেন প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা। তারা মনে করছেন, এই দুর্নীতির শিকড় আরও গভীরে এবং এর সঙ্গে জড়িত সব রাঘববোয়ালকে আইনের আওতায় আনা না গেলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরানো সম্ভব হবে না।

ষড়যন্ত্র না রোষানল :

এসব বিষয়ে সিএসপি প্রতিবেদকের সাথে মুঠোফোনে কথা হয় ডিসি আব্দুল আউয়ালের। বললেন, ষড়যন্ত্র না রোষানল,বুঝতে পারছেন না তিনি।

তবে তিনি বলেছেন, তবে তিনি বলেছেন, আমার ভাবনা হলো, বাংলাদেশের যে জায়গায় পদায়ন করবে আমার সেখানেই কাজ করতে হবে। আমার কোনো চয়েস নেই।

তিনি আরও বলেন, প্রশংসা যেমন আমাদের অনুপ্রাণিত করে, তেমনি সমালোচনা থেকে শিখতেও পারি। তবে অবশ্যই সেটা হতে হবে যৌক্তিক। আমার চলার পথে কোন ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন, যাতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারি।’

ডিসি মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল রংপুর জেলার মিঠাপুর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাষ্টার্স করেন এবং ২৫ তম ব্যাচে বিসিএস এর মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। তার পিতা একজন শিক্ষক ও মাতা একজন গৃহিনী, তিনি দুই সন্তানের জনক। তিনি দীর্ঘ সময় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর পরিচালক পদে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমান ডিসি ফরিদার বদলির আদেশ প্রত্যাহারে ছাত্রদের মানববন্ধন

এদিকে গত ২১ সেপ্টেম্বর দেশের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রামের ডিসি ফরিদা খানমকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে পদায়ন করার পর তার বদলির আদেশ প্রত্যাহারে জন্য মানববন্ধন করেছে ছাত্ররা।

‘জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র সমাজ, চট্টগ্রাম’ ব্যানারে শতাধিক শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে এ মানববন্ধন করা হয়।আউয়াল

এ সময় শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা বিভিন্ন ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড দেখা যায়- ‘ছাত্র-জনবান্ধব ডিসি ফরিদা খানমকে ফিরিয়ে আনো’, ‘অর্থের বিনিময়ে ডিসি নিয়োগ বন্ধ করো’, ‘আমরা ছাত্র, আমরা চট্টগ্রামের কল্যাণ চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান। শিক্ষার্থীরা মনে করেন রাজনৈতিক স্বার্থে ডিসি ফরিদাকে সরানো হয়েছে। আমরা মেনে নেব না।’

জানা গেছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ৫৯টি জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে একাধিক জেলাতে ডিসি পদে রদবদল আনছেন সরকার।

তারই অংশ হিসেবে দুদকে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর নওগাঁ জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হোন মোহাম্মদ আব্দুল আউয়াল।

আর চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক আবুল বশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামানকে সরিয়ে দিয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্বে আসেন নতুন জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম।

গত ৯ সেপ্টেম্বর সোমবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-২ শাখার স্মারক নং-০৫.০০.০০০০.১৩৯.১৯.০০১.২৪-৪০৬ মূলে উপসচিব হোসনা আফরোজ স্বাক্ষরিত জারীকৃত প্রজ্ঞাপনে উপসচিব ফরিদা খানমকে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।

প্রথমবারের মতো একজন নারী ডিসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ, বিশেষত নারী সমাজের মধ্যে তৈরি হয়েছিল নতুন এক আশাবাদ। তবে গত ২১ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসনের এক প্রজ্ঞাপনে দুই ডিসিকে নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় বিভিন্ন মহলে।