রাতের আঁধারে গোপনে চলছিল মদ তৈরির কাজ। বাইরে থেকে সাধারণ একটি বাসা—কিন্তু ভেতরে ছিল পুরো একটি কারখানা।
চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন দক্ষিণ মোহরা এলাকার একটি বাসায় পুলিশের অভিযানে বেরিয়ে আসে এই চিত্র। উদ্ধার করা হয় শত শত লিটার চোলাই মদ ও গাঁজনকৃত তরল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, বাড়িটি দেখে কখনো মনে হয়নি ভেতরে এমন কিছু চলছে। হঠাৎ পুলিশের অভিযানে আমরা অবাক হয়ে যাই।”
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) রাত পৌনে ১১টার দিকে দক্ষিণ মোহরা, ইস্পাহানী কেজি স্কুল সংলগ্ন পাঁচতলা হোসেন মোল্লার দোকানের পাশে আলী আকবরের ভবনে অভিযানটি পরিচালিত হয়।
চান্দগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহনেওয়াজ জানিয়েছে-পাহাড়ি এলাকা থেকে কাঁচামাল এনে নগরের ভাড়া বাসায় গড়ে তোলা এই কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন দুই নারীসহ ৬ জন।
গ্রেপ্তাররা হলেন-খাগড়াছড়ির বাঘাইছড়ি থানার সারোয়াতলী ইউপির শিজক এলাকার ললিত কুমার চাকমার ছেলে রিপন চাকমা, গুইমারা থানার হাকছড়ি ইউপির ছোট কালাপানি এলাকার যদুরঞ্জন চাকমার ছেলে বিপ্লব চাকমা ও মেয়ে রেবিকা চাকমা , সিন্দুকছড়ি ইউপির কলাছড়িপাড়ার অসুখ কুমার চাকমার ছেলে বাবুধন চাকমা এবং নাইক্ষ্যংছড়ির থানার দুল্যাতলী ইউপির কৈলাস মহাজন পাড়ার হরিমোহন চাকমার মেয়ে টুনি চাকমা (৩৯),ছেলে কৌশল বিকাশ চাকমা।
অভিযানে উদ্ধার করা হয়-৫১০ লিটার চোলাই মদ, ১০০০ লিটার পানি মিশ্রিত গাঁজনকৃত শর্করা জাতীয় তরল পদার্থ, ২টি সিলভারের ছিদ্রযুক্ত পাতিল, ২টি কড়াই সদৃশ সিলভারের পাতিল, ৩টি বড় পাতিল এবং চোলাই মদ বহনের জন্য ব্যবহৃত ৫০টি প্লাস্টিকের সেলাইনের প্যাকেট।
সোর্সের খবরে কারখানার সন্ধান :
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পার্বত্য এলাকা থেকে কাঁচামাল এনে নগরের একটি ভাড়া বাসায় কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। দক্ষিণ মোহরা এলাকার ইস্পাহানী কেজি স্কুল সংলগ্ন একটি ভবনে গড়ে তোলা হয়েছিল এই বিশাল চোলাই মদের কারখানা। বাইরে থেকে এটি ছিল একটি সাধারণ আবাসিক ফ্ল্যাট—ভেতরে চলছিল বাণিজ্যিক উৎপাদন। সোর্সের মাধ্যমে গোপন তথ্য পেয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে চোলাই মদ তৈরির সময় হাতে নাতে দুই নারীসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে চান্দগাঁও থানার কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুর হোসেন মামুন বলেন, গ্রেপ্তারদের অধিকাংশই পার্বত্য এলাকার বাসিন্দা। তারা সেখান থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে ভাড়া বাসায় কারখানা স্থাপন করেছিল। সেখানে তৈরি মদগুলো নগরের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছিল।
তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং এ ধরনের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।
নগরে মদের কারখানা,কী বলছে-বিশেষজ্ঞরা:
মদের কারখানা,অভিযান ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নগরের মধ্যে চোলাই মদের বিশাল এ কারখানা দেখে মনে হচ্ছে এটি দীর্ঘদিনের একটি আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কের চিত্র।
এটি একটি সুসংগঠিত সরবরাহ চেইনের অংশ, যা দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। কতিপয় দূর্ণীতিগ্রস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের প্রশ্রয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও চোলাই মদের এই গোপন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল দমন নয়—প্রয়োজন বিকল্প কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বৃদ্ধিরও উদ্যোগ নিলে এমন কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে।
ঐতিহ্য থেকে অপরাধ :
একসময় পার্বত্য অঞ্চলে চোলাই মদ ছিল স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু এখন তা বাণিজ্যিক ও অবৈধ ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। দ্রুত লাভের আশায় অনেকেই এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


