back to top

২৩ বস্তা নথিতে সম্পদের ছড়াছড়ি: দুদকের হাতে ‘মন্ত্রীসাম্রাজ্যের’ নকশা

প্রকাশিত: ০৪ মে, ২০২৬ ০৬:৩৫

সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে ঘিরে বিদেশে বিপুল সম্পদের যে চিত্র সামনে আসছে, তা কেবল অস্বাভাবিকই নয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক দুর্নীতি ইতিহাসে অন্যতম বড় নজির হতে পারে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তার ও তার পরিবারের নামে বিশ্বের অন্তত ৯টি দেশে ১১২২টি ফ্ল্যাট, প্লট ও বাড়ির তথ্য। এসব সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।

দুদকের তথ্য বলছে, সম্পদের বড় অংশই যুক্তরাজ্যে। যেখানে তার ৮০০’র বেশি স্থাবর সম্পত্তি। শুধু এই দেশেই সম্পদের মূল্য প্রায় ৮৫১০ কোটি টাকা।

বাকি সম্পদ ছড়িয়ে আছে কম্বোডিয়া, দুবাই, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, ভারত, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, বিদেশে গড়ে তোলা এই সম্পদভান্ডারের বড় অংশই আবাসিক ফ্ল্যাট।

তবে রয়েছে প্লট ও বাড়িও। এই বিপুল সম্পদের উৎস, ক্রয়পদ্ধতি এবং অর্থ স্থানান্তরের ধরন নিয়ে এখন প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠছে।

দুদক সূত্র জানায়, এসব সম্পদের তথ্য যাচাই করতে ৯টি দেশে মোট ১১টি মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি দেশ থেকে জবাব এসেছে। এই ধীরগতিই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, আইনি প্রক্রিয়ার এই বিলম্বের সুযোগে কিছু সম্পদ বিক্রি করে অর্থ দুবাইয়ে পাচারের চেষ্টা চলছে।

দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “সাইফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ৩০টি মামলা হয়েছে। আরও মামলা প্রক্রিয়াধীন। তবে কমিশনে শীর্ষ পদ শূন্য থাকায় অনুসন্ধান ও তদন্তে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে।”

তিনি আরও দাবি করেন, “বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন এবং একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদ বিক্রি করে অর্থ স্থানান্তর করছেন। ব্যাংক ঋণ অনিয়ম ও হুন্ডির মাধ্যমেও অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।”

এই অনুসন্ধানে সবচেয়ে বিতর্কিত তথ্যটি এসেছে নাগরিকত্ব নিয়ে। দুদকের ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের হাতে থাকা নথিতে দেখা যায়, তিনি ২০১২ সাল থেকেই ভারতের নাগরিক। তার নামে ইস্যুকৃত আধার কার্ডের তথ্যও পাওয়া গেছে।”

দুদকের অভিযানে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ২৩ বস্তা নথিপত্র জব্দ করা হয়। এসব নথিতে দেশ-বিদেশে সম্পদ ক্রয়-বিক্রয় এবং অর্থ পাচারের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে।

দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন জানান, সিআইডি, এনবিআরসহ ৯ সদস্যের একটি টাস্কফোর্স সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

ইতোমধ্যে ৩০টি মামলা দায়ের হয়েছে। বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দে আদালতের ৬টি ক্রোক আদেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে।

এই ঘটনাপ্রবাহ নতুন নয়। ২০২৩ সালে আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন “The Minister’s Millions”-এ প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে সাইফুজ্জামানের বিদেশি সম্পদের চিত্র সামনে আসে। তখনই যুক্তরাজ্যে শত শত সম্পত্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।

বর্তমানে আদালতের আদেশে তার নামে থাকা শত শত সম্পত্তি, ব্যাংক হিসাব, শেয়ার ও জমি জব্দ রয়েছে। একই সঙ্গে তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞাও কার্যকর রয়েছে।

এই বিপুল সম্পদের পুরো চিত্র কি সামনে এসেছে, নাকি আরও অনেক কিছু এখনও আড়ালে? দুদক বলছে, অনুসন্ধান চলছে। নতুন তথ্য মিললেই নেওয়া হবে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি