back to top

২০ মাস নেতৃত্বশূন্য চেম্বার, এক যুগ পর ভোটে ফিরল ব্যবসায়ীরা!

রিট, স্থগিতাদেশ ও বর্জনে নাটকীয় নির্বাচন-তপ্ত ব্যবসাঙ্গন

প্রকাশিত: ২৩ মে, ২০২৬ ০৮:১৫

ভোটকেন্দ্রের সামনে লম্বা সারি, ব্যালট হাতে উৎকণ্ঠিত মুখ, করমর্দন আর ফিসফাসে ভরা জটলা-সব মিলিয়ে যেন বহুদিনের দমবন্ধ নীরবতা ভেঙে চট্টগ্রামের ব্যবসাঙ্গনে ফিরে এসেছে নির্বাচনের পুরোনো উত্তাপ।

এক যুগ পর আবারও ভোটে ফিরেছেন ব্যবসায়ীদের সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।

কিন্তু সেই ফেরা ছিল না স্বাভাবিক কোনো গণতান্ত্রিক যাত্রা; ছিল রিট, আদালতের স্থগিতাদেশ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, বর্জনের ডাক এবং শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তার ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসা এক অস্থির নির্বাচন।

প্রায় ২০ মাস নেতৃত্বশূন্য থাকার পর অবশেষে শনিবার অনুষ্ঠিত হলো চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনটির নির্বাচন ঘিরে গত কয়েক মাসে যা ঘটেছে, তা শুধু একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নয়; বরং দেশের ব্যবসায়িক রাজনীতির ক্ষমতার হিসাব, প্রভাব বিস্তার এবং নিয়ন্ত্রণের কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

নগরের আগ্রাবাদে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নিচতলায় সকাল ৯টায় ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ভোটারদের উপস্থিতি দেখা যায় সকাল ৮টা থেকেই।

দীর্ঘদিন ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ না পাওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে ছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাস। কেউ বলছিলেন, “আজ অন্তত ভোটটা দিতে পারছি”; কেউ আবার বলছিলেন, “চেম্বারকে বাঁচাতে হলে ভোট দরকার ছিল।”

জানা গেছে, ২০১৩ সালের পর চট্টগ্রাম চেম্বারের আর কোনো নির্বাচন হয়নি। পরবর্তী সব কমিটি গঠিত হয়েছে সমঝোতা ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ফলে ধীরে ধীরে চেম্বার থেকে হারিয়ে যেতে থাকে নির্বাচনী সংস্কৃতি।

তৃণমূলের ব্যবসায়ীদের বড় অংশের অভিযোগ ছিল, সিদ্ধান্ত চলে যাচ্ছে সীমিত কয়েকটি বলয়ের হাতে। নেতৃত্ব নির্বাচনে সাধারণ সদস্যদের মতামতের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছিল বছর বছর।

এবার সেই জমে থাকা ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনার আবহেই ভোটের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। কিন্তু নির্বাচন সামনে আসতেই প্রকাশ্যে চলে আসে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর বিভক্তি।

একদিকে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ, অন্যদিকে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্বে ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম।

শুরু থেকেই দুই পক্ষের অবস্থান ছিল মুখোমুখি। আর সেই সংঘাত শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

চেম্বার নির্বাচনের তফসিল প্রথম ঘোষণা করা হয়েছিল গত বছরের ১১ আগস্ট। সে অনুযায়ী ১ নভেম্বর ভোট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ট্রেড গ্রুপ ও টাউন অ্যাসোসিয়েশন শ্রেণি নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার প্রশ্নে শুরু হয় বিরোধ।

একপর্যায়ে বিষয়টি পৌঁছে যায় এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালে। পরে আদালতে রিট হলে নির্বাচন কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।

জাতীয় নির্বাচনের কারণে ভোট পেছানো হয়। পরে আবার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু মার্চে সুপ্রিম কোর্টের শুনানির পর আবারও নির্বাচন ঝুলে যায়।

এরপর সালিসি ট্রাইব্যুনালের নির্দেশনায় নতুন তফসিলের প্রশ্ন ওঠে। উচ্চ আদালত, সালিসি ট্রাইব্যুনাল ও নির্বাচন বোর্ডের টানাপোড়েনে চেম্বারের ভবিষ্যৎ যেন আটকে যায় কাগজ, রিট আর আদেশের গোলকধাঁধায়।

সবশেষে গত বৃহস্পতিবার নতুন করে হাইকোর্টে রিট করেন এস এম নুরুল হক ও মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম। আদালত ছয় মাসের জন্য নির্বাচনে স্থগিতাদেশ দেন।

কিন্তু একই দিন বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত সেই আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিলে আবার ভোটের পথ খুলে যায়। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও নির্বাচন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয়।

এই নাটকীয়তার রেশ কাটতে না কাটতেই ভোটের আগের দিন নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ।

নগরের একটি পাঁচতারকা হোটেলে সংবাদ সম্মেলন করে প্যানেলটির নেতা এস এম নুরুল হক অভিযোগ করেন, আদালতের নির্দেশনা ও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা উপেক্ষা করে “তড়িঘড়ি ও পক্ষপাতমূলক” নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে।

তাঁর দাবি, ঈদুল আজহার আগমুহূর্ত ও হজ মৌসুমে অল্প সময়ের নোটিশে ভোট আয়োজন করে প্রকৃত ভোটার অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।

তবে সময়মতো প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের প্রার্থীদের নাম ব্যালট থেকে বাদ যায়নি।

ফলে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা এলেও ভোটের ব্যালটে তাঁদের নাম ও প্রতীক থেকেই যায়। এতে পুরো নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয় আরও বিভ্রান্তি ও উত্তেজনা।

তবু ভোটের দিন কেন্দ্রের চিত্র ছিল ভিন্ন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নিচতলায় ১৭টি বুথে চলতে থাকে ভোটগ্রহণ।

ব্যবসায়ীদের ভিড়, কুশল বিনিময়, হিসাব-নিকাশ আর ভোটের কৌশল—সব মিলিয়ে কেন্দ্রজুড়ে ছিল উৎসব ও উত্তেজনার মিশ্র আবহ।

জানা গেছে, চেম্বারের মোট ভোটার ৬ হাজার ৭৮০ জন। এর মধ্যে সাধারণ সদস্য ৪ হাজার ১ জন এবং সহযোগী সদস্য ২ হাজার ৭৬৪ জন। সাধারণ শ্রেণির ভোটাররা ১২টি এবং সহযোগী শ্রেণির ভোটাররা ৬টি করে ভোট দেন।

সাধারণ শ্রেণিতে ৩৭ জন এবং সহযোগী শ্রেণিতে ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

এছাড়া ট্রেড গ্রুপ ও টাউন অ্যাসোসিয়েশন থেকে ছয়জন পরিচালক প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে রয়েছেন।

ব্যবসায়ীদের অনেকেই বলছেন, এই নির্বাচন শুধু পরিচালক নির্বাচনের লড়াই নয়; এটি চেম্বারের নিয়ন্ত্রণ, প্রভাব ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের লড়াই। কারণ চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনির্ভর অর্থনীতির কেন্দ্র।

আমদানি-রপ্তানি, শিল্প বিনিয়োগ, ব্যাংকিং, শিপিং, গার্মেন্টস ও বাণিজ্য নীতিতে এই চেম্বারের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন নেতৃত্বশূন্য থাকায় ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চট্টগ্রামের স্বার্থ যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি।

বন্দর সংকট, ডলার–সংকট, আমদানি জটিলতা, করনীতি কিংবা শিল্প খাতের সংকট—বড় বড় ইস্যুতে চেম্বারের দৃশ্যমান ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ কারণেই এবারের নির্বাচনকে ব্যবসায়ীরা দেখছেন ‘নেতৃত্ব পুনর্গঠনের লড়াই’ হিসেবে।

ভোটকেন্দ্রে আসা একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, দীর্ঘদিন পর তাঁরা মনে করছেন চেম্বার আবার সদস্যদের সংগঠন হয়ে উঠতে পারে।

ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের নেতা আমিরুল হক বলেন, ব্যবসায়ীরা ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে চান এবং ভোটারদের উপস্থিতি সেটিই প্রমাণ করেছে।

অন্যদিকে নির্বাচন বর্জন করলেও সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ দাবি করছে, আদালতের চূড়ান্ত শুনানির আগেই ভোট আয়োজন করে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

চেম্বারের নির্বাচনী বোর্ড অবশ্য বলছে, আদালতের নির্দেশনা, আইনগত মতামত ও বিধিমালা অনুসরণ করেই নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে।

দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও দাবি করেছেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

তবে ভোট শেষ হলেও চট্টগ্রামের ব্যবসাঙ্গনের দ্বন্দ্ব যে শেষ হয়নি, সেটি স্পষ্ট। কারণ এই নির্বাচন কেবল ব্যালটের লড়াই নয়; এটি ব্যবসায়ী নেতৃত্বের আধিপত্য, প্রভাব ও ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের সংঘর্ষও।

আর সেই সংঘর্ষের রেশ আগামী দিনে চেম্বারের বোর্ডরুম থেকে শুরু করে দেশের বৃহত্তর বাণিজ্যনীতিতেও প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি