রাজীব সেন প্রিন্স: চট্টগ্রামে বাংলাদেশ টেলিভিশন কেন্দ্র (সিটিভি)র একটি কক্ষ বাইরে থেকে মনে হবে একটি সাধারণ সরকারি অফিস। প্রতিদিন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আসেন, যান, ফাইল চলে, অনুষ্ঠান সম্প্রচারের প্রস্তুতি হয়।
কিন্তু এই কেন্দ্রের একটি পদায়নকে ঘিরে সম্প্রতি সামনে আসা কিছু নথি এমন এক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যার উত্তর এখনো মেলেনি।
একজন সরকারি কর্মকর্তার নামে ২০ কোটি টাকা গ্রহণের উল্লেখ। ১৮ মাস পর ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। সঙ্গে একাধিক স্বাক্ষরিত ব্ল্যাঙ্ক চেক।
আর এসবের কেন্দ্রে বাংলাদেশ বেতারের কর্মকর্তা থেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার পদে পদায়ন পাওয়া মো. জাকির হোসেন।
নথিগুলো সত্য নাকি জাল-সেই বিতর্ক এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়। একটি সরকারি পদকে ঘিরে কেন এমন নথি তৈরি হবে? আর যদি নথি জাল হয়, তাহলে এর পেছনে কারা?
ঘটনাটি শুধু একজন কর্মকর্তার নয়, এটি সরকারি পদায়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা-জবাবদিহি ও জনআস্থার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার বা কন্ট্রোলার পদটি দীর্ঘদিন ধরেই আকাঙ্ক্ষিত একটি দায়িত্বপূর্ণ পদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
গেল ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মুহাম্মদ শরিফুল হক স্বাক্ষরিত এক আদেশে বাংলাদেশ বেতারের কেন্দ্রীয় বার্তা সংস্থার উপ-বার্তা নিয়ন্ত্রক ও ২৫ তম বিসিএস (তথ্য) ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনকে ওই পদে বদলী করা হয়। ৮ অক্টোবর তিনি ছাড়পত্র নেন। ৯ অক্টোবর চট্টগ্রাম কেন্দ্রে যোগদান করেন।
সরকারি চাকরিতে বদলী একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। কিন্তু যোগদানের পর যে নথি সামনে এসেছে, সেটিই পুরো ঘটনাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
২০ কোটি টাকা, ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ফেরত:
প্রতিবেদকের হাতে আসা ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর তারিখের একটি সম্মতিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে—
“আমার বিশেষ প্রয়োজনে ২৩ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করছি (আমি ২০ কোটি টাকা গ্রহণ করিব) এবং ১৮ মাস পর লভ্যাংশসহ ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা কাজের মাধ্যমে/নগদ ফেরত দিব।”
নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, চেকের মাধ্যমে ডিড এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন হবে এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবেন মো. সাইফুল করীম।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, নথিটিতে মো. জাকির হোসেনের নাম, পদবি এবং স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এখানেই শুরু হয়েছে রহস্য। একজন সরকারি কর্মকর্তা কেন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এমন বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেবেন?
আর যদি এটি ব্যক্তিগত ঋণের নথি হয়ে থাকে, তবে এর সঙ্গে সরকারি পদায়নের আলোচনার সম্পর্ক কেন তৈরি হচ্ছে?
ব্ল্যাঙ্ক চেকের ছায়া:
সূত্রগুলোর দাবি, সম্মতিপত্রের সঙ্গে জাকির হোসেনের স্বাক্ষরযুক্ত একাধিক ব্ল্যাঙ্ক চেকও সংযুক্ত ছিল।
বাংলাদেশের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত নানা বিরোধে ব্ল্যাঙ্ক চেক প্রায়ই বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে। কারণ, এতে পরবর্তী সময়ে অর্থের পরিমাণ বা প্রাপকের নাম বসানোর সুযোগ থাকে।
আইনজ্ঞদের মতে, ব্ল্যাঙ্ক চেক কোনো অপরাধের প্রমাণ নয়। তবে বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই ঘটনায়ও সেই প্রশ্ন উঠছে—চেকগুলো যদি সত্যিই তার স্বাক্ষরিত হয়, তাহলে সেগুলো কার কাছে গেল? আর যদি জাল হয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে?
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মো. জাকির হোসেন স্পষ্ট ভাষায় সবকিছু অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি এমন কোনো সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেননি।
তার ভাষায়, “এমন কোনো সম্মতি পত্রে আমি স্বাক্ষর করিনি। কেউ আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে এমনটি করেছে। এ বিষয়ে আমি আইনগত সহায়তা চেয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছি।”
তবে ব্ল্যাঙ্ক চেকের বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “চেকগুলো ব্যাংকে পেমেন্ট স্টপ করা হয়েছে।”
এদিকে কারা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন।
নীরবতা আরও বাড়াচ্ছে প্রশ্ন:
ঘটনার বিষয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. ইমাম হোসেনের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অনেক সময় কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীরবতাও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়।
কারণ, এমন আলোচিত নথি সামনে আসার পর প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয়েছে কি না, তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বদলী বাণিজ্যের পুরোনো অভিযোগ, নতুন অধ্যায়?
বাংলাদেশের প্রশাসনে বদলী ও পদায়নকে ঘিরে অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব, তদবীর, আর্থিক লেনদেন কিংবা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগগুলো প্রমাণের অভাবে আলোচনার গণ্ডি পেরোয় না।
তবে এই ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি লিখিত নথি এবং একাধিক চেকের কপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় কিছু চক্র কাঙ্ক্ষিত পদায়নের আশ্বাস দিয়ে আর্থিক লেনদেনের চেষ্টা করে। কখনো পদায়ন হয়, কখনো হয় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরে অর্থ আদায় নিয়ে বিরোধও সৃষ্টি হয়।
যদিও এই নির্দিষ্ট ঘটনায় এমন কোনো সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরোনো অভিযোগগুলোকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
এই ঘটনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন মাত্র দুটি। প্রথমত, সামনে আসা সম্মতিপত্র ও চেকগুলো আসল নাকি জাল?
দ্বিতীয়ত, যদি জাল হয়, তাহলে একজন সরকারি কর্মকর্তার নাম, পরিচয় ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে এমন নথি তৈরির পেছনে কারা রয়েছে? এই দুই প্রশ্নের উত্তরই পুরো ঘটনার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
আইনজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। কিন্তু যখন একটি পদায়নকে ঘিরে ২০ কোটি টাকা গ্রহণ, ৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, ব্ল্যাঙ্ক চেক এবং জাল স্বাক্ষরের মতো অভিযোগ একসঙ্গে সামনে আসে, তখন সেই আস্থার ভিত্তিই নড়ে ওঠে।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত সত্য হোক কিংবা পরিকল্পিত জালিয়াতি—দুই ক্ষেত্রেই একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কি কেবল যোগ্যতার ভিত্তিতে পূরণ হচ্ছে, নাকি পর্দার আড়ালে এমন কিছু ঘটে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না? মো. জাকির হোসেনের ঘটনাটি সেরকমই প্রশ্নের ইঙ্গিত বহন করছে।
সেই উত্তরই এখন খুঁজছে সংশ্লিষ্ট মহল। আর সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সিটিভির চেয়ার, ৩৩ কোটি টাকার চুক্তি আর জাকির হোসেনের রহস্য—জনমনে ঘুরপাক খাওয়া এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবেই থেকে যাবে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

