রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চেনামতি বড়ুয়া পাড়ায় নেমে এসেছে গভীর নীরবতা।
দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছেন। গ্রামের সরু পথগুলো প্রায় জনশূন্য। দূরে কোথাও কুকুরের ক্ষীণ ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।
কিন্তু সেই নীরবতার বুক চিরে হঠাৎ ভেসে আসে এক হৃদয়বিদারক চিৎকার।
প্রথমে কেউ বুঝে উঠতে পারেননি কী ঘটেছে। আশপাশের বাড়ির লোকজন দ্রুত ছুটে যান সুজন বড়ুয়ার বাড়ির দিকে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে জমতে থাকে মানুষের ভিড়।
কিন্তু ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে যে দৃশ্য তারা দেখতে পান, তা তাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ স্মৃতিগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
বাড়ির দরজার সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন এনি বড়ুয়া (৪০)। তার শরীরজুড়ে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন। পাশে পড়ে ছিল তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে পিয়াস বড়ুয়া। ছোট্ট শিশুটিও রক্তাক্ত। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল সে।
কিন্তু ঘরের ভেতরে অপেক্ষা করছিল আরও নির্মম এক দৃশ্য। মেঝেতে নিথর হয়ে পড়ে ছিল ১৬ বছর বয়সী কিশোরী মেয়ে প্রিয়ন্তী বড়ুয়া।
যে বয়সে একজন কিশোরীর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই তার জীবন থেমে গেল রক্তাক্ত এক রাতের অন্ধকারে।
একটি ঘর। একটি পরিবার। আর একই ঘরে পড়ে আছে মা ও মেয়ের নিথর দেহ। পাশেই মৃত্যুর বিভীষিকার সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে ছোট্ট শিশু পিয়াস।
প্রতিবেশীরা দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন। হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এনি বড়ুয়াকে আর বাঁচানো যায়নি। অন্যদিকে প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার জীবনও এর আগেই নিভে গেছে।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে পুলিশ। এর কিছু সময় পর ছুটে আসেন পরিবারের কর্তা সুজন বড়ুয়া।
কিন্তু তিনি আসেন একজন স্বামী বা বাবা হিসেবে নয়, ভেঙে যাওয়া একটি সংসারের শেষ সাক্ষী হিসেবে।
যেসময় নৃশংস হত্যাযজ্ঞটি ঘটে সেই সময় সুজন বড়ুয়া কর্মস্থলে ছিলেন। চট্টগ্রাম নগরীর খাতুনগঞ্জ এলাকার একটি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।
সংসারের জন্য রাত জেগে কাজ করা মানুষটি কল্পনাও করতে পারেননি, ঠিক তখনই তার নিজের ঘরে নেমে আসছে মৃত্যুর কালো ছায়া।
রাতের ফোনকলটি হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর ফোনকল। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে আতঙ্কিত কণ্ঠ।
বাড়িতে বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। দ্রুত চলে আসতে হবে। তারপর ছুটে চলা। অস্থির অপেক্ষা।
আর বাড়িতে পৌঁছে দেখা—এক ঘরেই পড়ে আছে তার স্ত্রী এনি বড়ুয়ার মরদেহ, কন্যা প্রিয়ন্তী বড়ুয়ার নিথর দেহ। আর রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে পাঁচ বছরের ছেলে পিয়াস।
যে ঘরে প্রতিদিন সন্ধ্যায় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসতেন, যে ঘরে মা মেয়েকে নিয়ে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতেন, যে ঘরে শিশুপুত্রের হাসিতে মুখর থাকত চারপাশ—সেই ঘরই পরিণত হয়েছে রক্তাক্ত মৃত্যুকূপে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ঘনীভূত হতে শুরু করেছে রহস্য।
সুজন বড়ুয়া দাবি করেছেন, প্রতিবেশী লিমন বড়ুয়া তেজপ্রিয়র সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেন ছিল। তার সন্দেহ, এই ঘটনার সঙ্গে ওই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তিনি আরও দাবি করেন, মৃত্যুর আগে তার স্ত্রী লিমন বড়ুয়ার নাম উল্লেখ করেছিলেন।
তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে পুলিশ।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুনায়েত চৌধুরী জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে।
মরদেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলার সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে এনির পরিবারের বিরোধ চলছিল। নিহতদের স্বজনদের ধারণা, সেই বিরোধের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
কিন্তু এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। কারা সেই ঘরে ঢুকেছিল? কেন এত নির্মমভাবে হত্যা করা হলো মা ও মেয়েকে? কেন রেহাই পেল না পাঁচ বছরের শিশুটিও? আর মৃত্যুর আগে এনি বড়ুয়া কি সত্যিই কাউকে শনাক্ত করে গিয়েছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে পুলিশ। অন্যদিকে চেনামতি বড়ুয়া পাড়ার মানুষ এখনো আতঙ্কে, শোকে এবং অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন।
কারণ এই হত্যাকাণ্ড একটি পরিবারের ভেঙে পড়ার গল্প। একজন স্বামীর মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার গল্প।একজন বাবার কন্যাহারা হওয়ার গল্প। আর পাঁচ বছরের এক শিশুর জীবনের শুরুতেই ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হওয়ার গল্প।
হয়তো বড় হয়ে পিয়াস একদিন জানতে পারবে, সেই রাতে কী হয়েছিল। কিন্তু সে কখনো জানতে পারবে না—মায়ের শেষ স্পর্শটি কেমন ছিল, কিংবা বোনের শেষ ডাকটি কেমন শোনাত।
আনোয়ারার সেই রক্তাক্ত রাত এক পরিবারের থেমে যাওয়া জীবনের গল্প, যার রক্তের দাগ মুছে গেলেও স্মৃতি হয়তো অনেক দিন ধরে তাড়া করে ফিরবে পুরো জনপদকে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

