জীবিকার নৌযানই হলো মৃত্যুফাঁদ: দুই নাবিকের মৃত্যু, সংকটাপন্ন প্রকৌশলী তামিম

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬ ১৫:১১

জীবনের তাগিদে প্রতিদিনের মতোই কাজে নেমেছিলেন তাঁরা। নদীর বুকে নোঙর করা মাছ ধরার নৌযানেই কেটেছে তাঁদের দিনের পর দিন।

পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে কিংবা সংসারের চাকা সচল রাখতে সমুদ্র আর নদীকেই বেছে নিয়েছিলেন জীবিকার পথ হিসেবে।

কিন্তু সেই নৌযানই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল মৃত্যুফাঁদ। কর্ণফুলী নদীর বুকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই বদলে দিল কয়েকটি পরিবারের জীবন।

চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা এফভি দেশ নামের একটি মাছ ধরার নৌযানে (ফিশিং ভেসেল) অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন নৌযানটির গ্রিজার (ইঞ্জিন বিভাগের কারিগরি কর্মী) মো. রুবেল (৩২) ও শাহ আলম (৪০)।

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়ার পথে তাঁদের মৃত্যু হয়।

একই ঘটনায় শতভাগ দগ্ধ নৌযানটির ক্যাডেট প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

বর্তমানে তিনি ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্য, তাঁর শারীরিক অবস্থা এখনও অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

আজ বুধবার সকালে নিহত দুই নাবিকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন জাহাজের ক্যাপ্টেন জুবায়ের মাহমুদ।

তিনি জানান, ঢাকায় পাঠানো তিন দগ্ধ নাবিকের মধ্যে রুবেল ও শাহ আলম মারা গেছেন। প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিমের চিকিৎসা চলছে।

এদিকে দুই পরিবারের ঘরে ইতোমধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পটুয়াখালীর গলাচিপার বাসিন্দা রুবেলের মরদেহ আজ সকালে নিজ এলাকায় নেওয়া হয়। সকাল ১০টায় জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

অন্যদিকে নোয়াখালীর বাসিন্দা শাহ আলমের জানাজা আজ সকাল ৮টায় অনুষ্ঠিত হয়।

পরে তাঁকেও পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। জীবিকার সন্ধানে নদীতে যাওয়া দুই মানুষ এবার ফিরলেন, তবে নিথর দেহ হয়ে।

ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১টার দিকে। কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা এফভি দেশ নামের মাছ ধরার নৌযানে হঠাৎ বিস্ফোরণের পর ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে আগুন গ্রাস করে নৌযানের একটি অংশ।

এ ঘটনায় এফভি দেশের ক্যাডেট প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম, নাবিক মো. রুবেল ও শাহ আলম দগ্ধ হন।

আগুনের তাপ ও বিস্ফোরণের প্রভাবে পাশে নোঙর করা এফভি ডিজনি-র নাবিক নিজাম উদ্দিন, মো. রাসেল ও ছিদ্দিক আহমেদও দগ্ধ হন।

দুর্ঘটনার পর আহত ছয়জনকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

তাঁদের মধ্যে শতভাগ দগ্ধ আশিকুজ্জামান তামিম, রুবেল ও শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। কিন্তু রাজধানীতে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কাছে হার মানেন রুবেল ও শাহ আলম।

ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক শাওন বিন রহমান জানান, আশিকুজ্জামান তামিম বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শতভাগ দগ্ধ হওয়ায় তাঁর অবস্থা এখনও সংকটাপন্ন।

অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা নিজাম উদ্দিন, মো. রাসেল ও ছিদ্দিক আহমেদ আশঙ্কামুক্ত হওয়ায় আজ সকালে তাঁদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ।

কর্ণফুলীর এই অগ্নিকাণ্ড দুটি প্রাণ কেড়ে নিয়ে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে একাধিক পরিবারকে। যে নৌযানে দাঁড়িয়ে মানুষ স্বপ্ন দেখে পরিবারের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার, সেই নৌযানই কখনও কখনও হয়ে ওঠে নির্মম মৃত্যুফাঁদ।

রুবেল ও শাহ আলমের জীবনের শেষ কর্মদিবস তাই এখন স্বজনদের কাছে এক গভীর বেদনার স্মৃতি।

আর হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিমকে ঘিরে এখনও বেঁচে আছে একটি পরিবারের শেষ আশাটুকু।

এখন সংশ্লিষ্টদের নজর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের দিকে। একই সঙ্গে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মাছ ধরার নৌযানে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদারের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি