চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা চেনা সংকট হলেও এবার তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এক নতুন, ভয়ংকর বিষফোঁড়া।
বর্ষার এক পশলা বৃষ্টি মানেই যেখানে সাধারণ মানুষের স্বস্তি, সেখানে ২৩০ স্ট্র্যান্ড রোডের বাংলা বাজার মুন্সিবাড়ি এলাকার মানুষের বুকে ভর করে এক চটচটে, কালো আতঙ্ক।
এখানে আকাশ মেঘলা হলেই বাসিন্দাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, এবার কোন ঘরটা ভাসবে বিষাক্ত বর্জ্য তেলের আস্তরণে?
জলাবদ্ধতার চেনা নোংরা পানির সঙ্গে এবার মিশে গেছে কুচকুচে কালো ব্যবহৃত তেল (বর্জ্য তেল)।
সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকার ড্রেন উপচে এই তৈলাক্ত বিষাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে মানুষের উঠান, রান্নাঘর, এমনকি শোবার ঘরেও।
তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ, পিচ্ছিল পথ আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা এখন সম্পূর্ণ অচল।
সরেজমিনে বাংলা বাজার মুন্সিবাড়ি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব ও নারকীয় দৃশ্য। বৃষ্টির পানি নেমে গেলেও ঘরের মেঝে, আসবাবপত্র আর দেয়ালে লেপ্টে আছে কালো তেলের পুরু স্তর। বাতাস ভারী হয়ে আছে পোড়া তেলের এক তীব্র, দমবন্ধ করা দুর্গন্ধে।
এলাকার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, অন্য এলাকায় বৃষ্টি হলে মানুষ ঘর থেকে পানি সেচে পরিষ্কার করে, কিন্তু এখানে পানি সেচার পরও চটচটে ভাব দূর হয় না।
সাবান-ডিটারজেন্ট দিয়েও ঘরের মেঝে থেকে এই তেলের দাগ ও গন্ধ দূর করা যাচ্ছে না।
বিশেষ করে রান্নাঘর ও শোবার ঘরে এই পানি ঢুকে পড়ায় গৃহবধূদের দুর্ভোগের শেষ নেই। তীব্র গন্ধের কারণে ঘরে টিকে থাকা কিংবা খাবার মুখে তোলাই দায় হয়ে পড়েছে।
এই পরিবেশগত বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশু এবং বয়স্করা। তেলের কারণে পুরো এলাকার অলিগলি ও সড়ক এতটাই পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে যে, খালি পায়ে হাঁটার কোনো উপায় নেই।
সামান্য অসাবধানতায় পিছলে পড়ে হাত-পা ভাঙার ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। বাধ্য হয়ে অভিভাবকেরা শিশুদের ঘরের বাইরে বের হওয়া এবং খেলাধুলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট কেবল যাতায়াতের দুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন এক নীরব জনস্বাস্থ্য সুনামি।
চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, ব্যবহৃত বা বর্জ্য তেলের এই নোংরা পানি ত্বকে দীর্ঘক্ষণ লেগে থাকলে তীব্র চুলকানি, অ্যালার্জি, একজিমা, ফুসকুড়ি ও স্থায়ী চর্মরোগ দেখা দিতে পারে।
দূষিত পানির সংস্পর্শে ডায়রিয়া, আমাশয় ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়াচ্ছে, পানির ওপর ভাসমান তেলের স্তর অনেক সময় মশার প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে, যা চলমান বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নেপথ্যে রেলওয়ের জমি ও ‘প্রভাবশালী’ সিন্ডিকেট
হঠাৎ এই বর্জ্য তেল কোত্থেকে আসছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার পাশেই রেলওয়ের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে গড়ে উঠেছে একটি কালো তেলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
কোনো প্রকার পরিবেশগত ছাড়পত্র বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না মেনেই দীর্ঘদিন ধরে সেখানে উন্মুক্তভাবে এই তেলের কারবার চলছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের একাংশের স্পষ্ট অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় এক প্রভাবশালী চক্রের ছত্রছায়ায় ও সহযোগিতায় এই ক্ষতিকর ব্যবসাটি পরিচালিত হচ্ছে।
ফলে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ কর্তৃপক্ষের কান পর্যন্ত পৌঁছালেও তা আলোর মুখ দেখছে না।
পরিবেশবিদদের মতে, এই সংকটের ভয়াবহতা সুদূরপ্রসারী। ড্রেন বেয়ে এই বর্জ্য তেল সরাসরি মিশে যাচ্ছে শহরের প্রধান খাল ও জলাশয়ে।
তেল পানির ওপর একটি নিরেট স্তর তৈরি করে, যা বাতাসে থাকা অক্সিজেনকে পানিতে দ্রবীভূত হতে বাধা দেয়।
এতে জলজ প্রাণীর অক্সিজেন সংকট তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাছাড়া, এই তেল মাটিতে মিশে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি চিরতরে নষ্ট করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি আর কেবল প্রথাগত ‘জলাবদ্ধতা’ বা পানি নিষ্কাশনের সমস্যা নেই। এটি এখন একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য হরণ, পরিবেশ বিপর্যয় এবং সরকারি সম্পত্তি বেদখলের এক সমন্বিত অপরাধ।
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই যদি স্ট্র্যান্ড রোডের এই ‘বিষফোঁড়া’ উপড়ে ফেলা না যায়, তবে বাংলা বাজার মুন্সিবাড়ি এলাকার মানুষের জীবনমান ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের এখন একটাই আকুতি, প্রভাবশালীদের স্বার্থ বড়-নাকি হাজারো মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার বড়?
প্রশাসন কি এবারও নীরব থাকবে, নাকি দ্রুত এই অবৈধ তেলের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়ে এলাকাটিকে রক্ষা করবে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

