কাগজে-কলমে চালানটির পরিচয় ছিল স্রেফ ‘পুরোনো গাড়ির ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ ও পেট্রল ইঞ্জিন’।
কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে সেই ৪০ ফুটের বিশাল কনটেইনারের সিলগালা ভাঙতেই উপস্থিত কর্মকর্তাদের চোখ চড়কগাছ!
ঝুলকালি মাখা যন্ত্রাংশের বদলে ভেতরে চকচক করছে জার্মানির বিখ্যাত বিএমডব্লিউ আর জাপানের বিলাসবহুল লেক্সাস ব্র্যান্ডের গাড়ির অংশ, পাঁচটি হাফ-কাট ট্রাক এবং আন্তর্জাতিকভাবে সাড়াজাগানো হোন্ডা বি১৮সি টাইপ-আর ইঞ্জিনের বিশাল সশস্ত্রে বহর।
জাপান থেকে আসা এই চালানে ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পণ্যের কোনো মিলই পাননি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
১৬৭টি প্যাকেজে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ৮ হাজার ১৮ কেজি পণ্যের এই চালানটি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার মালামাল।
কাস্টমসের হিসাব অনুযায়ী, জব্দ করা পণ্যের সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকা।
কর্মকর্তাদের মতে, দেশে সম্পূর্ণ তৈরি বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতে দিতে হয় প্রায় আকাশচুম্বী শুল্ক-কর। এই কর ফাঁকি দিতেই একশ্রেণির অসাধু আমদানিকারক নিয়েছে কায়দা-কানুন ও ধূর্ততার নতুন পথ।
বিদেশ থেকে গাড়িগুলোকে মাঝখান থেকে বা বিভিন্ন অংশে কেটে ‘ইউজড পার্টস’ বা ‘হাফ-কাট’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নিয়ে আসা হয়। এতে কাগজের খাতায় গাড়ি হয়ে যায় কম দামি লোহালক্কড় ও পুরোনো পার্টস, আর শুল্কের পরিমাণ নেমে আসে তলানিতে।
কিন্তু এখানেই নাটকের শেষ নয়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জে এমনই একটি অবৈধ বিএমডব্লিউ গাড়ি আটক করেছিল কাস্টমস গোয়েন্দা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই কায়দায় আমদানি করা টুকরো টুকরো যন্ত্রাংশ জোড়া দিয়ে স্থানীয় একটি গ্যারেজেই বানিয়ে ফেলা হয়েছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বিএমডব্লিউ গাড়ি! এমনকি রাস্তায় চালানোর জন্য তাতে বসানো হয়েছিল অন্য এক পুরোনো বিএমডব্লিউর রেজিস্ট্রেশন নম্বর।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, এটি কেবল কর ফাঁকির মামুলি অপরাধ নয়। এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে চোরাচালান ও অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) মতো বড় আন্তর্জাতিক অপরাধ।
মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানিকৃত পণ্যের মূল দাম আড়াল করা এবং বাকি অর্থ অবৈধ পথে পরিশোধ করা হয়েছে কি না-তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যাংকিং নথি, বাণিজ্যিক দলিল ও অর্থ পরিশোধের মাধ্যম নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করছেন তদন্তকারীরা।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, জালিয়াতি রুখতে এখন থেকে ঝুঁকিপূর্ণ আমদানিকারকদের চালান কড়া নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
কায়িক পরীক্ষার পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া প্রতিটি পণ্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে আইন অনুযায়ী কঠোর জরিমানা ও শুল্ক-কর আদায়ের আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।
কাগজের খেলায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির এই অভিনব ফাঁদ উন্মোচনের পর বন্দরজুড়ে এখন জোর আলোচনা-যন্ত্রাংশের ছদ্মবেশে আর কত বিলাসী গাড়ি পার পেয়ে গেছে অতীতে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


