বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ফাইন্যান্স অ্যাডভাইজার অ্যান্ড চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার (এফএঅ্যান্ডসিও) দপ্তর ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী অনিয়ম ও ঘুষ সিন্ডিকেট।
কর্মচারীদের পে-ফিক্সেশন থেকে শুরু করে অবসরোত্তর পেনশন ও পরিবারকল্যাণ তহবিলের অর্থ ছাড়করণ, প্রতিটি ধাপে ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে এসেছে পূর্বাঞ্চলের এফএঅ্যান্ডসিও সাইদুর রহমান এবং তাঁর দপ্তরের হিসাবরক্ষক শেখ জামালের নাম।
অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, চরম বৈষম্য ও দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন প্রধানত রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, মৃত কর্মচারীদের বিধবা স্ত্রী এবং প্রতিবন্ধী সন্তানরা।
কোনো বৈধ পাওনাদার ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর নথিপত্র ঝুলিয়ে রাখা হয় মাসের পর মাস। অন্যদিকে, নির্দিষ্ট হারে অনৈতিক সুবিধা দিলে ওয়েলফেয়ার বা মাঠপর্যায়ের প্রয়োজনীয় তদন্ত ছাড়াই দ্রুততম সময়ে অনুমোদিত হচ্ছে নাম-বেনামের ফাইল।
এতে করে প্রকৃত পেনশনাররা একদিকে তাঁদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, দপ্তরটির কিছু কর্মকর্তার হটকারী সিদ্ধান্তের কারণে পেনশন কার্যালয়টি সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) থেকে হঠাৎ টিএ পলোগ্রাউন্ডে স্থানান্তর করা হয়েছিল।
এতে বয়োবৃদ্ধ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী পেনশনারদের যাতায়াত এবং আইভাস প্লাস (iBAS++) সংক্রান্ত কারিগরি সমস্যা মেটাতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
পরবর্তীতে সেবাগ্রহীতাদের তীব্র প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে দপ্তরটি আবার সিআরবিতে ফেরত আনা হলেও ভোগান্তি কমেনি।
সম্প্রতি ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ব্যবস্থা চালুর পর প্রবীণ ও পারিবারিক পেনশনারদের মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক হিসাব সংক্রান্ত কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয়।
নিয়ম অনুযায়ী ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনিক নথিপত্র দ্রুত হালনাগাদ করার কথা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইচ্ছাকৃতভাবে মাঠপর্যায় থেকে ফাইলের গতি শ্লথ করে দেন।
ফাইল নিষ্পত্তির নামে পেনশনারদের সরাসরি হিসাব দপ্তরে ডেকে এনে দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের ঘুষ।
নিয়ম অনুযায়ী, একজন কর্মচারীর মৃত্যুর পর তাঁর বৈধ উত্তরাধিকারীকে পারিবারিক পেনশন দিতে পরিচয় নিশ্চিতকরণ, চাকরির নথি যাচাই এবং প্রাপ্যতার হিসাব মেলানো আবশ্যক।
তবে অভিযোগ রয়েছে, এফএঅ্যান্ডসিও দপ্তরের এই সিন্ডিকেট তদন্ত প্রক্রিয়ার নামে হয়রানি সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করছে। দাবিকৃত টাকা পরিশোধ করলে কোনো যাচাই-বাছাই ও নথিপত্র পরীক্ষা ছাড়াই ফাইল অনুমোদন পেয়ে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে অযোগ্য ব্যক্তি বা ভুয়া পরিচয়ে সরকারের অর্থ উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য মারাত্মক হুমকি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক কর্মচারী জানান, পারিবারিক পেনশনসহ নানাবিধ হিসাব নিকাশ ঘিরে এই দুর্নীতি নতুন নয়। সাইদুর রহমান ও শেখ জামালের অতিষ্ঠে আমরা সাধারণ কর্মচারীরা পুরোপুরি অসহায়। উপযুক্ত তদন্ত হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
রেলওয়ের আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পে-ফিক্সেশন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে একজন কর্মচারীর জীবনমানের আর্থিক নিরাপত্তা জড়িত। সেখানে দুর্নীতি বা অহেতুক বিলম্ব হলে কর্মচারীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
পেনশন সংক্রান্ত এসব অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এফএঅ্যান্ডসিও সাইদুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অভিযুক্ত হিসাবরক্ষক শেখ জামালের সঙ্গেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য নিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম পিইঞ্জের মুঠোফোনে চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।সূত্র-এসএস
তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, সরকারের বিভিন্ন মেয়াদের বকেয়া বিল, পে-ফিক্সেশনের অনুমোদন, ব্যাংকের লেনদেন নথি এবং সম্প্রতি অনুমোদিত পারিবারিক পেনশনের ফাইলগুলো দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট অর্থ নিরীক্ষা বিভাগ দ্বারা নিরপেক্ষ পুনঃনিরীক্ষা করা হোক।
দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের অর্জিত পাওনা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি


