চট্টগ্রাম নগরীর প্রবেশদ্বার চান্দগাঁওয়ের রাস্তার মাথা এলাকা। যেখানে দিন-রাত মানুষের চলাচল থামে না। সেই জায়গাটিই এখন অভিযোগ অনুযায়ী পরিণত হয়েছে প্রকাশ্য মাদকবাজারে। এই বাজারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে উঠে এসেছে একটি পুরোনো নাম। মো. আবুল হোসেন।
স্থানীয়দের দাবি, “আগে লুকিয়ে-চুরিয়ে হতো, এখন প্রকাশ্যে রেললাইনের পাশে বসে ইয়াবা-গাঁজা বিক্রি হয়।” ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে এসে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
বর্তমানে বাহির সিগনাল থেকে রাস্তার মাথা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় তার নিয়ন্ত্রিত চক্র নিয়মিত মাদক বিক্রি করছে বলে অভিযোগ।
সিএনজি চালক থেকে কোটি টাকার ‘টোকেন সিন্ডিকেট’
রাঙ্গুনিয়ার মরিয়মনগরের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা আবুল হোসেনের শুরুটা ছিল সিএনজি চালক হিসেবে। কিন্তু দ্রুতই বদলে যায় তার জীবনপথ।
চান্দগাঁও থানার মোহরা কাপ্তাই রাস্তার মাথায় সিএনজি লাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু করেন ‘টোকেন বাণিজ্য’—যা মূলত চাঁদাবাজির একটি সংগঠিত রূপ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ৩ হাজার সিএনজি অটোরিকশা ছিল এই সিন্ডিকেটের আওতায়। প্রতিটি থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় হয়।
মাসিক আয় ৫০–৬০ লাখ টাকা। বছরে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন। এই অর্থের বড় অংশই পরবর্তীতে মাদক ও জুয়ার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ্যারেজের আড়ালে জুয়ার আসর, ‘টার্গেট’ ধনীরা
রাস্তার মাথার রেলবিট সংলগ্ন একটি গ্যারেজটি বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও ভেতরে চলত অন্য খেলা। স্থানীয় সূত্র বলছে, সেখানে নিয়মিত বসত জুয়ার আসর। মাদক সেবনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ধনী বা ব্যবসায়ী শ্রেণির লোকদের টার্গেট করে সেখানে কৌশলে আটকে রেখে আদায় করা হতো মোটা অঙ্কের টাকা। এই অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে ঘুরলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
১৭ মামলার আসামি—তবুও থামেনি অপরাধ
মো. আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও, কোতোয়ালি ও রাউজান থানায় মাদক, অস্ত্র চাঁদাবাজি, জুয়াসহ রয়েছে অন্তত ১৭টি মামলা। এসব মামলায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হলেও প্রতিবারই জামিনে বেরিয়ে এসে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ রয়েছে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক পালাবদল, বদলায় ছত্রছায়া?
স্থানীয় বেশ কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবুল হোসেনের অবস্থানও বদলেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়ে ছিলেন অঘোষিত এ ইয়াবা সম্রাট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েন।
তবে বর্তমানে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভোল পাল্টে আবার সক্রিয় হয়ে উঠছেন। স্থানীয়দের একটি অংশ সরাসরি অভিযোগ করেছেন, মোহরা ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক ইকবাল উর রহমান চৌধুরী-এর ছত্রছায়ায় তিনি পুনরায় সংগঠিত হচ্ছেন।
তবে ইকবাল চৌধুরী এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন গণমাধ্যমকে বলেন, “হোসেনকে চিনি, তবে সে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।”
প্রশাসনের ভূমিকা: অজানা, নাকি নীরবতা?
চান্দগাঁও থানার ওসি জানিয়েছেন, ওই এলাকায় নিয়মিত মাদক বিক্রির বিষয়টি তার জানা নেই।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন যেখানে প্রকাশ্যে রেললাইনের পাশে বসে মাদক বিক্রি হয়, সেখানে পুলিশের অজ্ঞতা কি গ্রহণযোগ্য? নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো প্রভাব?
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও, চান্দগাঁওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কীভাবে একজন চিহ্নিত অপরাধী আবারও তার সাম্রাজ্য গড়ে তুলছে? এটি কি প্রশাসনের ব্যর্থতা? নাকি প্রভাবশালী মহলের নীরব আশ্রয়?



