back to top

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলরুটে ৭২ গেটের মধ্যে ৫৬টিই ‘মৃত্যুফাঁদ’

নেই গেটম্যান-ব্যারিয়ার-আড়াই বছরে ৩৪ মৃত্যু, দায় কার?

প্রকাশিত: ২০ এপ্রিল, ২০২৬ ১৫:২৩

বিশেষ প্রতিবেদন : চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলরুট এখন এক ভয়াবহ ঝুঁকির নাম। উন্নত রেললাইন, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা। সব থাকলেও বাস্তবে নিরাপত্তার চিত্র উল্টো।

এ রুটটির ৭২টি রেলগেটের মধ্যে ৫৬টিই অরক্ষিত। নেই ব্যারিয়ার, নেই গেটম্যান। ফলে প্রতিদিনই মানুষ ও যানবাহন রেললাইনে ঢুকে পড়ছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ডিইএন-১) দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রুটে মোট বৈধ গেট মাত্র ১৬টি। এসব গেট পরিচালনায় রয়েছেন ৫৪ জন অস্থায়ী গেটম্যান। বাকি বিপুলসংখ্যক গেট স্থানীয়দের চলাচলের সুবিধায় তৈরি হলেও সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

বিপদের উৎস-অরক্ষিত ৫৬ গেট:
রেলওয়ে সূত্র বলছে, অনেক গেট স্থানীয় বাসিন্দারা নিজ উদ্যোগে তৈরি করেছেন। আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টেও নেই কোনো তদারকি ব্যবস্থা। ফলে সিগন্যাল না মেনে হঠাৎ করে রেললাইনে ঢুকে পড়ছে যানবাহন ও পথচারীরা।

এ অবস্থায় আধুনিক ‘অটোমেটিক গেট সিস্টেম’ থাকলেও তা কার্যত কাজে আসছে না। লোকবল ও ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রযুক্তির সুবিধা সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।

আড়াই বছরে ৩৪ মৃত্যু: বাড়ছে অচেনা লাশের সংখ্যা
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলরুটে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন অন্তত ৩৪ জন। এর মধ্যে অনেকের পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।

এই সময়ে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় ৩০টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে রেল পুলিশ। চকরিয়ায় একদিনে ৫ প্রাণহানি—এরুটে ভয়াবহ দুর্ঘটনার রেকর্ড। ২০২৫ সালের ২ আগস্ট কক্সবাজারের রামুতে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

ট্রেনের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষে প্রাণ হারান পাঁচজন। ভারুয়াখালী থেকে রামু যাওয়ার পথে রশিদনগর রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন—চালক হাবিব উল্লাহ (৫০), যাত্রী রেনু আরা (৪৫), তার বোন আসমা আরা (১৩), এবং দুই শিশু—আশেক উল্লাহ ও আতা উল্লাহ (৩ ও দেড় বছর বয়সী)।

এছাড়াও গত আড়াই বছরে রেললাইনে প্রাণ গেছে একাধিক মানুষের। এর মধ্যে গেল ৭ ফেব্রুয়ারি চকরিয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে গোলবাহার বেগম (৫৮) নামে এক বৃদ্ধা নারী নিহত হয়েছেন। নিহত গোলবাহার বেগম পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং এজাহার আহমদের মেয়ে।

গত বছরের ৩১ আগস্ট লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের আলী বাপের পাড়া এলাকায় দিনমজুর মো. হাসানের ছিন্নভিন্ন লাশ উদ্ধার করা হয়। তিনি ওই ইউনিয়নের হাদুর পাহাড় এলাকার সৈয়দ আহমেদের ছেলে।

ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর চন্দনাইশে নয়ন (২৮), ২৪ নভেম্বর চকরিয়ায় অজ্ঞাত ব্যক্তি এবং ২৫ নভেম্বর রেজু আরা বেগম (৫২) নামে এক বৃদ্ধা নারী ওষুধ কিনতে বের হয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়েছেন।

এ বিষয়ে গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল হাসান বলেন, ‘২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ জন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ৩০টি। এসব ঘটনায় অনেক লাশের পরিচয় এখনও অজানা।

‘রেড জোন’ রেললাইন: পাথর নিক্ষেপ ও ছিনতাইয়ে আতঙ্ক
দুর্ঘটনার পাশাপাশি বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা ও অপরাধপ্রবণতা। রেল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঈদগাঁ, ডুলাহাজারা, রামু ও চকরিয়ার মধ্যবর্তী তিনটি কালভার্টকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনে অন্তত ছয়বার পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চার দিনের ব্যবধানে আহত হয়েছেন তিনজন।

গত ৩ মার্চ রাতে পর্যটন এক্সপ্রেস ট্রেনে সংগঠিত হয় ভয়াবহ পাথর নিক্ষেপ। প্রায় ২০–২৫ জনের একটি দল ব্রিজের আশপাশ থেকে আক্রমণ চালায়। ধারণা করা হচ্ছে, নির্জন এলাকায় ডাকাতির উদ্দেশ্যেই এই ঘটনা ঘটানো হয়।

এ বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষ থেকে জনবল সংকট ও সচেতনতার ঘাটতির কথা বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ (ডিইএন-১) দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. ইমরান বলেন, আরও জনবল বৃদ্ধি করতে রেল মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

রেলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ আবু রাফি মো. ইমতিয়াজ হোসেন বলেন, অটোমেটিক সিগন্যাল ব্যবস্থা থাকলেও মানুষ সচেতন নন। প্রযুক্তি থাকলেও তা ব্যবহারের সুযোগ সীমিত।

অন্যদিকে বিভাগীয় কর্মব্যবস্থাপক মুস্তাফিজুর রহমান জানান, ১৬টি গেটে ৫৪ জন গেটম্যান থাকলেও বাকি ৫৬টি গেট সম্পূর্ণ অরক্ষিত।

এখন প্রশ্ন একটাই—দায় কার?
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলরুটে একদিকে আধুনিক প্রযুক্তির দাবি, অন্যদিকে অরক্ষিত গেট, অপ্রতুল গেটম্যান এবং লাগামহীন মানবিক অবহেলা।

সব মিলিয়ে এই রুট এখন কেবল যোগাযোগপথ নয়-বরং একের পর এক মৃত্যুর নীরব করিডর।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি