back to top

প্রবাসের স্বপ্ন ভেঙে ফিরল ৪ ভাইয়ের লাশ, মায়ের বুকজুড়ে শুধুই শূন্যতা

প্রকাশিত: ২০ মে, ২০২৬ ০৮:৩৭

• দেশে ফেরার কথা ছিল দুজনের, ফিরলেন চারজনই কফিনবন্দী হয়ে
• শেষ ভয়েস মেসেজে বলেছিলেন ‘গাড়ি থেকে বের হতে পারছি না’
• পাশাপাশি কবর খুঁড়ে দাফন

ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। রাঙ্গুনিয়ার লালানগরের সরু পথ ধরে একের পর এক গাড়ি এসে থামছে একটি বাড়ির সামনে।

চারটি কফিন নামানো হচ্ছে ধীরে ধীরে। আর সেই দৃশ্য দেখেই বুক চাপড়ে আহাজারিতে ভেঙে পড়ছেন এক মা।

কখনো এক কফিনের গায়ে হাত রেখে কাঁদছেন, কখনো আরেকটির দিকে ছুটে যাচ্ছেন। আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখেও তখন পানি। পুরো এলাকা যেন এক মুহূর্তে শোকের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

যে চার ছেলে সংসারের অভাব ঘোচাতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে পাড়ি দিয়েছিলেন, বছরের পর বছর প্রবাসে কষ্ট করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই চার ভাই এবার ফিরলেন একসঙ্গে-তবে জীবিত নয়, কফিনবন্দী মরদেহ হয়ে।

গতকাল মঙ্গলবার রাত নয়টার দিকে ওমান থেকে চার ভাইয়ের মরদেহ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়।

সেখানে উপস্থিত থেকে মরদেহ গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী। এরপর গভীর রাতে অ্যাম্বুলেন্সে করে কফিনগুলো নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর এলাকায় তাঁদের বাড়িতে।

আজ বুধবার ভোরে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে আসতে শুরু করেন।

কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, একসঙ্গে চার ভাইয়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু হতে পারে। বাড়ির উঠানে পাশাপাশি রাখা চারটি কফিন যেন পুরো এলাকার বুকের ওপর নেমে আসা এক বিশাল শোকের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

নিহত চার ভাই হলেন শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ভাইদের মধ্যে দুজনের আগামী ১৫ মে দেশে ফেরার কথা ছিল। পরিবারে আনন্দের প্রস্তুতিও চলছিল।

স্বজনদের জন্য উপহার কিনতে চার ভাই একটি গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তাঁদের শেষ যাত্রা।

গত বুধবার রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকায় একটি গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় চার ভাইয়ের মরদেহ।

রয়্যাল ওমান পুলিশের ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজোস্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাস নেওয়ার ফলে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও ছিল বাঁচার আকুতি।

চট্টগ্রাম সমিতি, ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী জানান, ওই দিন সন্ধ্যায় চার ভাই বারকা এলাকায় ছিলেন। পরে সেখান থেকে মুলাদ্দাহর দিকে রওনা দেন।

রাত আটটার পর তাঁদের একজন বারকায় থাকা এক স্বজনকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে বলেন, “আমরা খুব অসুস্থ… গাড়ি থেকে বের হতে পারছি না।” সঙ্গে পাঠানো হয় তাঁদের অবস্থানের লোকেশনও। কিন্তু সাহায্য পৌঁছানোর আগেই নিভে যায় চারটি জীবন।

রাতে মুলাদ্দাহ এলাকায় পার্ক করে রাখা গাড়িটির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে দুই বাংলাদেশি প্রবাসী পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ এসে দরজা খুলে চার ভাইয়ের নিথর দেহ উদ্ধার করে।

নিহতদের খালাতো ভাই এমরান হোসেন বলেন, “চার ভাইয়ের জন্য পাশাপাশি কবর খোঁড়া হয়েছে। এমন দৃশ্য জীবনে কখনও দেখব ভাবিনি।” তাঁর কণ্ঠেও তখন কান্না।

আজ বেলা ১১টার দিকে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার সময় পুরো এলাকা কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে।

কেউ চোখ মুছছিলেন, কেউ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অনেকের মুখে তখন একটাই কথা—“একসঙ্গে চার ভাইকে হারানোর শোক এই পরিবার কীভাবে সহ্য করবে?”

সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী বলেন, “একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুতে পুরো রাঙ্গুনিয়ার মানুষ শোকাহত। সরকারের পক্ষ থেকে দাফন ও পরিবহন খরচের জন্য পরিবারটিকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।”

প্রবাস মানেই স্বপ্ন। পরিবারের জন্য একটু স্বচ্ছলতা, মায়ের মুখে হাসি, ছোট ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই। সেই স্বপ্ন নিয়েই চার ভাই দেশ ছেড়েছিলেন। অথচ শেষ পর্যন্ত তাঁদের ফিরতে হলো চারটি কফিনে শুয়ে।

রাঙ্গুনিয়ার আকাশে এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস। আর এক মায়ের বুকজুড়ে জমে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী শূন্যতা।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিনি/আরএসপি