back to top

নৌ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরও গৃহকর পরিশোধে অনীহা বন্দরের

রাস্তা ভাঙে বন্দরের ভারী যান, কর দিতেও আপত্তি—ক্ষোভ মেয়রের

প্রকাশিত: ২১ মে, ২০২৬ ০৫:৪৭

চট্টগ্রাম বন্দরের ভারী যানবাহনে প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে নগরের সড়ক ও সেতু। অথচ সেই নগরেরই অন্যতম বৃহৎ করদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ন্যায্য গৃহকর পরিশোধে আপত্তি তুলেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এমন অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।

দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এবার বন্দর কর্তৃপক্ষের বার্ষিক গৃহকর ৪৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেছে চসিক।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ও চিঠি দিয়ে চসিকের নির্ধারিত কর পরিশোধের নির্দেশনা দিলেও এখনো কার্যত অনড় অবস্থানে রয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও দেশের অন্যতম বৃহৎ নগর প্রশাসনের এই দ্বন্দ্ব নতুন করে প্রকাশ্যে এসেছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন গত ৩ মে আপিল শুনানি শেষে বন্দরের নতুন গৃহকর নির্ধারণ করে। শুনানিতে মেয়র শাহাদাত হোসেনসহ দুই সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরদিন ৪ মে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নতুন কর পরিশোধের নোটিশ পাঠানো হয়।

চসিকের দাবি, বন্দরের ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট স্থাপনার বিপরীতে আইন অনুযায়ী গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছে।

যৌথ জরিপ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই কর ধার্য করা হয়। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ স্থাপনার পরিমাণ মেনে নিলেও করের হিসাব মানতে নারাজ।

বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি নগরের এক অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেয়র শাহাদাত হোসেন।

তিনি বলেন, নগরের অধিকাংশ সড়কের ধারণক্ষমতা ১০ টন হলেও বন্দরের ৪০ থেকে ৫০ টনের ভারী যানবাহন প্রতিনিয়ত চলাচল করছে।

এতে সড়ক, সেতু ও নগর অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ সেই বন্দর কর্তৃপক্ষই চসিকের ন্যায্য গৃহকর পরিশোধে আপত্তি তুলছে।

চসিক সূত্র জানায়, গৃহকর নিয়ে বিরোধ নিরসনে গত বছরের ১৪ আগস্ট আট সদস্যের একটি যৌথ কমিটি গঠন করা হয়।

ওই কমিটির জরিপে বন্দরের স্থাপনার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ১ কোটি ৭৩ লাখ বর্গফুট। এরপর সেই হিসাব অনুযায়ী ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা গৃহকর নির্ধারণ করা হয়।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী সঠিকভাবে কর নির্ধারণ করা হয়নি।

গত ২৮ এপ্রিল করা আপিলে তারা উল্লেখ করে, যৌথ জরিপ অনুযায়ী তাদের প্রকৃত গৃহকর হওয়া উচিত ১৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।

অথচ বর্তমানে তারা ৪৫ কোটি টাকা পরিশোধ করছে, যা প্রকৃত করের তুলনায় তিন গুণের বেশি।

বন্দর কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, পাঁচ বছর অন্তর গৃহকর পুনর্মূল্যায়নের বিধান রয়েছে। সে হিসাবে নতুন কর কার্যকর হতে পারে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে, বর্তমান অর্থবছরে নয়।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নে বন্দরের গৃহকর নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ১৬০ কোটি টাকা।

কিন্তু বন্দরের আপত্তির মুখে সাবেক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর সময়ে তা কমিয়ে ৪৫ কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়। পরে মেয়র শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব নেওয়ার পর পুনরায় পূর্ণাঙ্গ কর আদায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এদিকে গৃহকর পরিশোধ বিষয়ে নির্দেশনা চেয়ে গত ১৩ এপ্রিল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জবাবে ২২ এপ্রিল মন্ত্রণালয় জানিয়ে দেয়, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ এবং মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী কর নির্ধারণের এখতিয়ার সিটি করপোরেশনের। একই সঙ্গে চসিক নির্ধারিত গৃহকর পরিশোধ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

তবে সেই নির্দেশনার পরও নতুন কর পরিশোধে অনীহা দেখাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকেই গৃহকর পরিশোধ বন্ধ রেখেছে সংস্থাটি।

এ বিষয়ে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, শুনানিতে বন্দরের পক্ষ থেকে আবার কর পুনর্মূল্যায়নের দাবি করা হলেও বিধি অনুযায়ী সেই সুযোগ নেই।

তবে চাইলে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আপিল করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত করের ৭৫ শতাংশ আগে জমা দিতে হবে।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্বে) সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, নতুন গৃহকরের নোটিশ তারা পেয়েছেন এবং বিষয়টি বিধি অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভর করে দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ কার্যক্রম। আবার এই বন্দরকেন্দ্রিক কার্যক্রমের চাপই সবচেয়ে বেশি পড়ে চট্টগ্রাম নগরের সড়ক, ড্রেনেজ ও নগর অবকাঠামোর ওপর।

ফলে গৃহকর নিয়ে এই দ্বন্দ্ব এখন শুধু দুই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এটি নগর অবকাঠামোর ব্যয় বহন, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও রূপ নিয়েছে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি