চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে কুরবানির পশুর হাট যেন পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে। ব্যস্ত রেললাইনের ওপর ও আশপাশে গরু-ছাগল বেঁধে প্রকাশ্যে চলছে কেনাবেচা।
কোথাও রেলের সিগন্যাল পোস্টে, কোথাও পয়েন্টের চাবিতে, আবার কোথাও রেললাইনের স্লিপারের সঙ্গে বাঁধা কুরবানির পশু।
হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ছুটে এলে মুহূর্তেই শুরু হয় আতঙ্কিত ছোটাছুটি। জীবন বাঁচাতে ক্রেতা-বিক্রেতারা গরুর দড়ি টেনে রেললাইন ছাড়তে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
চারদিকে তখন চিৎকার, ধাক্কাধাক্কি আর বিশৃঙ্খলা। যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা।
অথচ এমন স্পষ্ট ঝুঁকি ও আইন লঙ্ঘনের পরও রহস্যজনকভাবে নীরব সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও রেল কর্তৃপক্ষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোটা অঙ্কের উৎকোচের বিনিময়ে এই অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পশুর হাট বসাতে দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রেললাইনের হাটহাজারী রেলস্টেশন এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে কুরবানির পশুর অস্থায়ী বাজার। রেললাইনের দুই পাশে গরু-ছাগল নিয়ে সারি সারি বসেছেন বিক্রেতারা।
অনেকে আবার রেললাইনের ওপরই বসে আছেন পশু নিয়ে। ট্রেন চলাচলের পথ দখল করে এমন বেপরোয়া অবস্থায় চলছে পশু কেনাবেচা।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, বিক্রেতারা রেলের গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল, পয়েন্টের চাবি ও অবকাঠামোর সঙ্গে পশু বেঁধে রাখছেন। এতে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকিই বাড়ছে না, রেল চলাচল ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ট্রেন আসার শব্দ শোনা মাত্র পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন পশু সরাতে গিয়ে কেউ রেললাইনে পড়ে যাচ্ছেন, কেউ দড়িতে পা জড়িয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে মোট ২০ ফুট এলাকা সবসময় সংরক্ষিত। ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের প্রবেশও নিষিদ্ধ।
ট্রেন চলাচলের সময় তো বটেই, সাধারণ সময়েও সেখানে গবাদিপশু রাখার কোনো সুযোগ নেই।
আইনের ১০১ ধারা অনুযায়ী, এই সীমার মধ্যে কাউকে পাওয়া গেলে গ্রেপ্তার করা যায়। এমনকি গবাদিপশু পাওয়া গেলে তা আটক করে বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধানও রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। আইনের তোয়াক্কা না করেই প্রকাশ্যে চলছে এই ঝুঁকিপূর্ণ পশুর হাট।
প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। রেলওয়ের পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়নি কঠোর ব্যবস্থা। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও উদ্বেগ।
উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে কুরবানির পশু কিনতে আসা ক্রেতাদের সাথে কথা হলে তারা জানায়, আর মাত্র কদিন পরেই কোরবানির ঈদ। অস্থায়ী পশুর হাটটি বাড়ি থেকে কাছে হওয়ায় এখানে এসেছি। তবে এখানে এসে ভয়ের মধ্যেই আছি। ট্রেন আসলে সবাই দৌড় দেয়। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা হতে পারে।”
আরেকজন ক্রেতা এর জন্য প্রশাসনক দায়ি করে বলেন, “সরকার যেহেতু রাজস্ব নিচ্ছে, নিরাপদ জায়গায় হাটের ব্যবস্থা করা উচিত। রেললাইনের পাশে এভাবে বাজার বসানো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ এই হাট বসাতে প্রভাবশালী একটি চক্র সক্রিয়। তাদের সহযোগিতায়ই দিনের পর দিন রেললাইনের ওপর বাজার পরিচালিত হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তবে রেললাইনের ওপর পশুর হাট বসানোর কথা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন হাটের ইজারাদার পৌরসভার চন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইব্রাহিম সওদাগর। তিনি বলেন, “পুরো বাংলাদেশেই বসাচ্ছে। তাই আমিও রেললাইনের ওপর পশুর হাট বসিয়েছি।”
এ বিষয়ে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুমিন বলেন, “পৌরসভা থেকে রেললাইনের ওপর কোনো পশুর হাট বসানোর ইজারা দেওয়া হয়নি। আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন বলেন, “রেললাইনে পশুর হাট বসানোর কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে সচিবের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। বিষয়টি জেনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রতিদিন হাজারো মানুষের সামনে প্রকাশ্যে রেললাইনের ওপর পশুর হাট চললেও এতদিন কেন কার্যকর অভিযান হয়নি? কেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নীরব?
তাঁদের আশঙ্কা, অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা ও প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যে হাটহাজারীর এই অবৈধ পশুর হাট এখন ভয়ংকর এক বিপর্যয়ের অপেক্ষায়।
একটি মাত্র ভুল, একটি হোঁচট কিংবা একটি আতঙ্কিত ছুটোছুটি—আর তাতেই মুহূর্তে ঝরে যেতে পারে বহু প্রাণ।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



