চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে নতুন মোটরচালিত হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন ২৮ বছর বয়সী শওকত হোসেন। মাথা নিচু, মুখে লাজুক নীরবতা। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মা সানু বেগম বারবার ছেলের দিকে তাকাচ্ছিলেন।
চোখে তখন স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা আর বহুদিনের জমে থাকা কষ্টের ছাপ। যেন বহু বছর পর প্রথমবারের মতো তাঁর মনে হয়েছে—ছেলেটা এবার একটু হলেও নিজের মতো চলতে পারবে।
চট্টগ্রামের বন্দর থানার ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শওকত জন্মের দুই বছর পর থেকেই প্যারালাইজড।
জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে ঘরের এক কোণে। নিজের পায়ে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, একা কোথাও যাওয়ার সামর্থ্যও ছিল না তাঁর।
শওকতের বাবা নুর মোহাম্মদ পেশায় নিরাপত্তাকর্মী। সামান্য আয়ে কোনো রকমে চলে সংসার।
এর মধ্যেই বড় ছেলের চিকিৎসা, ওষুধ ও দেখাশোনার ব্যয় পরিবারটিকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলে। একটি হুইলচেয়ারের প্রয়োজন বহুদিনের হলেও অর্থাভাবে সেটিও ছিল অধরা।
সানু বেগম জানান, একটি হুইলচেয়ারের জন্য তিনি বহু মানুষের দ্বারে দ্বারে গেছেন। কেউ আশ্বাস দিয়েছেন, কেউ পরে আসতে বলেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত সহায়তা।
শেষ ভরসা হিসেবে গত বুধবার তিনি যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার কাছে, যিনি সারাদেশে মানবিক ডিসি হিসেবে পরিচিত। সেই দিনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
সানু বেগম বলেন, “আমি আসলে মোটরের হুইলচেয়ার চাইতেও পারিনি। লজ্জা লাগছিল। শুধু বলছিলাম, একটা হুইলচেয়ার হলে আমার ছেলেটা একটু বসতে পারত। স্যার আমার সব কথা ধৈর্য ধরে শুনেছেন।”
তাঁর ভাষ্য, কথা শোনার পর জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পরে শনিবার জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে শওকতের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি নতুন মোটরচালিত হুইলচেয়ার। পাশাপাশি ওষুধ ও পুষ্টিকর খাবার কেনার জন্য দেওয়া হয় নগদ আর্থিক সহায়তাও।
হুইলচেয়ারের হাতলে হাত রেখে শওকত তখন নীরবে বসে ছিলেন। তবে তাঁর মায়ের কণ্ঠে ছিল দীর্ঘদিনের ক্লান্তি পেরোনো এক স্বস্তির সুর।
“বৃষ্টির সময় ঘরে পানি পড়ে। আমার পঙ্গু ছেলেটা অনেক সময় ভিজে থাকত। নিজে তো নড়াচড়া করতে পারে না। এখন অন্তত হুইলচেয়ার নিয়ে একটু বাইরে যেতে পারবে,” বলেন তিনি।
সহায়তা প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “সমাজের অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। জেলা প্রশাসন সবসময় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে।”
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের লাল ভবনের সামনে সেদিন হয়তো কোনো বড় রাষ্ট্রীয় ঘোষণা হয়নি। হয়নি আনুষ্ঠানিক কোনো আয়োজনও। কিন্তু এক অসহায় পরিবারের জন্য সেটি ছিল জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক বিকেল।
কারণ, কখনো কখনো একটি হুইলচেয়ার শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়—এটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার নতুন সাহস, নতুন স্বাধীনতা এবং মানুষের প্রতি আস্থা ফিরে পাওয়ার এক নীরব প্রতীক।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



