চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী অঙ্গনে যেন এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। যে ব্যক্তি হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি, ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ এবং দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়ে একসময় পলাতক ছিলেন, যার বিরুদ্ধে ছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং যিনি ঋণ খেলাপির অভিযোগে একটি জাতীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন, সেই মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরী কীভাবে এখন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি?
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজে এখন এ প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে শিল্প-বাণিজ্য অঙ্গনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ঘুরছে একই বিস্ময়।
“যেখানে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে একজনের প্রার্থিতা বাতিল হয়, সেখানে একই ব্যক্তি কীভাবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে উঠে আসেন?”
সম্প্রতি চট্টগ্রাম চেম্বারের নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই নতুন করে সামনে এসেছে রাইজিং গ্রুপ, ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি, দুদকের মামলা এবং আমজাদ হোসেন চৌধুরীর বিতর্কিত আর্থিক অতীতের দীর্ঘ তালিকা।
একদিকে ‘অযোগ্য’, অন্যদিকে ‘সহ-সভাপতি’ :
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ)-এর নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন আমজাদ হোসেন চৌধুরী।
কিন্তু নির্বাচনের আগেই তার বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপির অভিযোগ সামনে আসে। প্রার্থিতা নিয়ে আপত্তি ওঠার পর নির্বাচন বোর্ড ও আপিল বোর্ডে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাদায়ী ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নির্বাচন আপিল বোর্ড শেষ পর্যন্ত তার প্রার্থিতা বাতিল করে।
নির্বাচন বোর্ডের নথিতে উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে। আর্থিক দায়-দেনা, ঋণ পুনঃতফসিল এবং অনাদায়ী অর্থের বিষয়গুলোও শুনানিতে উঠে আসে।
বোর্ডের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজভাঙা শিল্পের নেতৃত্বে আর্থিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ ব্যক্তিদের থাকা প্রয়োজন। ঋণ খেলাপির অভিযোগ থাকা কাউকে সভাপতি করা হলে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কিন্তু ব্যবসায়ী মহলের প্রশ্ন—যে অভিযোগে একটি সংগঠন তাকে অযোগ্য ঘোষণা করল, সেই একই ব্যক্তি কীভাবে চট্টগ্রাম চেম্বারের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হলেন?
রাইজিং গ্রুপ: উত্থান থেকে ঋণ কেলেঙ্কারি :
তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাইজিং গ্রুপের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন আমজাদ হোসেন চৌধুরী।
২০১৩ সালের পর থেকে গ্রুপটির একের পর এক প্রতিষ্ঠান ঋণ খেলাপিতে জড়িয়ে পড়ে। ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রাইজিং গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগটি এবি ব্যাংকের। রাইজিং স্টিল পুরোনো জাহাজ আমদানির জন্য ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তিনটি এলসির বিপরীতে এবি ব্যাংক চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ৩২৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেয়। অভিযোগ, সেই অর্থ আর ফেরত যায়নি।
২০১৬ সালের ১৬ জুলাই ৩২৫ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৯৫৫ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের উপসহকারী পরিচালক মানিকলাল দাশ বাদী হয়ে ডবলমুরিং থানায় মামলা করেন।
মামলায় আসামি করা হয় আমজাদ হোসেন চৌধুরী, জসীম চৌধুরীসহ বাংলাদেশ ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে।
শুধু এবি ব্যাংক নয়, রাইজিং গ্রুপটির একই কর্তাদের বিরুদ্ধে সাউথইস্ট ব্যাংকের হালিশহর শাখা থেকে ১৪৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ আত্মসাতের অভিযোগেও ২০১৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর আরেকটি মামলা হয়।
১৫ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি:
দুদক সূত্রে জানা যায়, অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় আমজাদ হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ১৫টি মামলায় চার্জশিট দাখিল করা হয়।
এসব মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি ও তার ভাই জসীম চৌধুরী দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন।
২০২১ সালের ২৬ জানুয়ারি দুদকের মানি লন্ডারিং শাখা তাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেশের সব বন্দরে চিঠি পাঠায়।
কিন্তু এরপরও ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করেন আমজাদ হোসেন চৌধুরী।
চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর তাকে আদালতে পাঠানো হলে আদালত জেলহাজতে পাঠান।
দুদক কর্মকর্তারা সে সময় জানিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ মামলাসহ ১৫টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর ছিল।
এর পরের বছর ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের আরেক ভাই ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন চৌধুরীকেও গ্রেপ্তার করে র্যাব-৭। তার বিরুদ্ধেও চট্টগ্রাম ও ঢাকায় একাধিক মামলা ছিল।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর বদলে যায় চিত্র :
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
এরপর রাইজিং গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ঋণ খেলাপি ও অর্থ আত্মসাৎ মামলার আসামিরা একে একে জামিনে বের হয়ে আসেন।
বর্তমানে আমজাদ হোসেন চৌধুরী এখন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন চেম্বারের সহ-সভাপতি।
এই বাস্তবতাই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—ব্যবসায়ী নেতৃত্ব নির্ধারণে কি আর্থিক স্বচ্ছতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবই বড় হয়ে উঠছে?
ব্যবসায়ী সমাজে বাড়ছে অস্বস্তি :
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সমাজের একাংশ মনে করছে, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে যারা আসবেন, তাদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যাংকিং রেকর্ড কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, ঋণ খেলাপি ও আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা যদি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্বে বসেন, তাহলে পুরো ব্যবসায়ী সমাজের গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ব্যাংকের হাজার কোটি টাকা আটকে রেখে, মামলার আসামি হয়েও যদি কেউ ব্যবসায়ী সমাজের নেতা হন, তাহলে সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য এটি অপমানজনক বার্তা।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই প্রশ্ন ঘুরছে-“ঋণ খেলাপির দায় কি শুধুই সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্য? প্রভাবশালীদের জন্য কি আলাদা নিয়ম?”
তবে এসব অভিযোগ, মামলা ও বিতর্কের বিষয়ে এখন পর্যন্ত মো. আমজাদ হোসেন চৌধুরীর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা না এলে এই বিতর্ক আরও গভীর হতে পারে।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



