back to top

কান্না, বমি, শ্বাসকষ্ট-তারপর একে একে ৬ মৃত্যু: কী ঘটেছিল সেই রাতে?

প্রকাশিত: ২৭ মে, ২০২৬ ০৭:১০

রাতটা হওয়ার কথা ছিল নতুন জীবনের প্রথম রাত। সন্তান জন্মের পর মায়েদের চোখে ছিল স্বস্তি, স্বজনদের মুখে ছিল আনন্দের ক্লান্তি।

পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডজুড়ে শোনা যাওয়ার কথা ছিল সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুদের স্বাভাবিক কান্না। কিন্তু সেই কান্নাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিণত হয় আতঙ্কে, অসহায়তায়, তারপর মৃত্যুতে।

একটির পর একটি শিশু কান্না করছিল। কেউ বমি করছিল, কারও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মায়েরা বুঝতে পারছিলেন কিছু একটা অস্বাভাবিক হচ্ছে।

কিন্তু ঠিক কী—তা জানতেন না কেউ। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডজুড়ে বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা। আর সকাল হতে না হতেই সেই ওয়ার্ড পরিণত হয় শোকের ঘরে।

রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে মঙ্গলবার রাতের সেই বিভীষিকাময় ঘটনায় অন্তত ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে স্বজনদের অভিযোগ, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করছে পুলিশ।

হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, মৃত শিশুদের বয়স ছিল মাত্র এক থেকে দুই দিন। তারা সবাই পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। ওই ওয়ার্ডে ১১ জন মা ও ছয়জন নবজাতক ছিল বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

কিন্তু স্বজনদের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক ভয়ংকর রাতের ছবি।

এক শিশুর দাদী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “রাতে দেখি বাচ্চাগুলো অস্বাভাবিকভাবে কাঁদছে। একটার পর একটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিল। ডাক্তার-নার্স কাউকে ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছিল না। আমরা শুধু দৌড়াদৌড়ি করেছি।”

তিনি জানান, তার নাতনিকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে বলে আশ্বস্ত করা হয়।

চিকিৎসার কথা বলে ওষুধ কেনাতে কয়েক হাজার টাকা খরচ করানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পর গিয়ে জানতে পারেন, শিশুটি আর বেঁচে নেই।

তার কণ্ঠে তখন শুধু একটাই প্রশ্ন—“যদি বাঁচাতেই না পারেন, তাহলে আগে বলেননি কেন?”

নিজের সন্তান হারানো আরেক মা বলেন, “রাতের দিকে প্রায় সব বাচ্চাই কান্না করছিল। কেউ বমি করছিল, কারও নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো সাধারণ কিছু। কিন্তু পরে দেখি একে একে সবাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে।”

তিনি জানান, সকালে তার শিশুর অবস্থার অবনতি হলে বাইরে নেওয়া হয়। পরে এনআইসিইউতে স্থানান্তর করা হলেও কিছু সময় পর চিকিৎসকেরা মৃত্যুসংবাদ দেন।

মায়ের চোখে তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না—মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও যে সন্তান বুকের কাছে নড়ছিল, সে আর নেই।

স্বজনদের অভিযোগ, পুরো রাতজুড়ে ওয়ার্ডে ছিল চরম বিশৃঙ্খলা। পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স না থাকায় দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া যায়নি।

তারা দাবি করেন, শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ থাকলেও শুরুতে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এদিকে এসির গ্যাস লিকেজের অভিযোগও উঠেছে। যদিও হাসপাতাল কিংবা পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি নিশ্চিত করেনি।

হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, প্রথমে দুটি শিশু অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার উন্নতি হওয়ায় আবার ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।

কিন্তু সকাল ছয়টার দিকে শিশুদের আবারও অসুস্থতা দেখা দিলে পুনরায় এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে ভেন্টিলেশনে রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, তিনি ঘটনার খবর পেয়েছেন এবং বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হবে।

কিন্তু তদন্তের আগেই অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বজনদের মনে। কেন একই ওয়ার্ডে থাকা একের পর এক শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ল?

কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? কেন অসহায় মায়েদের পুরো রাত আতঙ্কে কাটাতে হলো?

যে ওয়ার্ডে নতুন জীবনের প্রথম নিঃশ্বাস শোনা যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে এক রাতেই থেমে গেল ছয়টি কোমল প্রাণের শ্বাস।

সকাল হওয়ার আগেই কয়েকজন মা হয়ে গেলেন সন্তানহারা। আর হাসপাতালের করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল বুকফাটা কান্না, যার প্রতিধ্বনি হয়তো অনেক দিন ধরে তাড়া করে ফিরবে সেই রাতের প্রত্যেক সাক্ষীকে।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি