আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফেরার কথা ছিল তাদের। বাড়িতে অপেক্ষা করছিল উৎসবের প্রস্তুতি, স্বজনদের মুখে ছিল বিয়ের আনন্দের আলোচনায় ভরা দিনগুলোর পরিকল্পনা।
এক ভাইয়ের বিয়ে ঘিরে শুরু হয়েছিল নতুন স্বপ্নের বুনন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হলো না—চিরতরে থেমে গেল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার একই পরিবারের চার সহোদরের জীবনের গল্প।
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দারাজার পাড়া এলাকার চার ভাই—রাসেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম।
ছিলেন দীর্ঘদিনের ওমান প্রবাসী। প্রবাসের কঠিন জীবনযুদ্ধের ভেতরেও তারা পরিবারে স্বপ্ন বুনছিলেন একসঙ্গে ফেরা, একসঙ্গে নতুন আনন্দ ভাগাভাগি করার।
পরিবারে পরিকল্পনা ছিল, আগামী ১৫ মে দুই ভাই দেশে ফিরবেন। একই সময়ে আরেক ভাইয়ের বিয়ের আয়োজন ঘিরে ব্যস্ততা চলছিল গ্রামে।
সেই বিয়ের কেনাকাটার দায়িত্ব ও আনন্দ ভাগ করে নিতে চার ভাইই একসঙ্গে বের হয়েছিলেন। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল জীবনের শেষ সফর।
গাড়ির ভেতরেই নিভে যায় চারটি জীবন:
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে মঙ্গলবার (১২ মে) রাতে ওমানের মুলাদ্দা এলাকায়। ধারণা করা হচ্ছে, গাড়ির ভেতরে এসি চালু অবস্থায় থাকা বা গ্যাস লিকেজজনিত বিষক্রিয়ার কারণে তারা অচেতন হয়ে পড়েন।
ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে কারও নজরে না আসায় সময় গড়িয়ে যায়। পরে বুধবার সকাল ৮টার দিকে স্থানীয় লোকজন গাড়ির ভেতরে অচেতন অবস্থায় তাদের দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির ভেতর থেকেই চার ভাইয়ের নিথর দেহ উদ্ধার করে।
প্রাথমিকভাবে পুলিশ দুর্ঘটনাজনিত বিষক্রিয়াকে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ধারণা করলেও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
স্বপ্নের কেনাকাটা, যা আর শেষ হলো না :
নিহত চার ভাইয়ের মধ্যে দুইজনের দেশে ফেরার কথা ছিল কয়েক দিনের মধ্যেই। বাড়িতে অপেক্ষা করছিল মা–বাবা, আত্মীয়–স্বজন, আর এক ভাইয়ের বিয়ের আয়োজন।
গ্রামে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছিল বিয়ের প্রস্তুতির আলোচনা। সেই আনন্দের অংশ হতে প্রবাসে থাকা চার ভাই একসঙ্গে বের হয়েছিলেন কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তারা আর ফিরে আসেননি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওমানে অবস্থানরত একই এলাকার বাসিন্দা বাবুর মাধ্যমে প্রথমে ঘটনার খবর জানা যায়।
পরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন পরিবারের আরেক সদস্য এনামুল ইসলাম। প্রতিবেশী মো. ইয়াকুব জানান, গাড়ির ভেতরে তাদের অচেতন অবস্থায় পাওয়ার পরই বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
বর্তমানে মরদেহগুলো রুস্তাক থানার হেফাজতে রয়েছে। পরবর্তীতে সেগুলো মাস্কাটে নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
রাঙ্গুনিয়ায় শোকের স্তব্ধতা :
চার সহোদরের একসঙ্গে মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দারাজার পাড়া এলাকায় নেমে আসে গভীর শোক।
যে বাড়িতে কিছুদিন আগেও বিয়ের আনন্দের প্রস্তুতি চলছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্না আর নিস্তব্ধতা।
গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া ভারী হয়ে উঠেছে। প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কেউই এই মর্মান্তিক বাস্তবতা সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যু যেন পুরো এলাকার মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
প্রবাস জীবনের কষ্ট আর অপূর্ণ ফেরা :
প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারে সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছিলেন চার ভাই। সেই স্বপ্নের ভেতরেই ছিল দেশে ফেরা, পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি, নতুন জীবনের সূচনা।
কিন্তু সেই স্বপ্ন আর বাস্তব হলো না। যে বাড়িতে একসঙ্গে ফেরা ও বিয়ের আনন্দের অপেক্ষা ছিল, সেখানে এখন শুধুই শূন্যতা আর শোক।
পরিবার এখনো মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে স্বজনদের আহাজারি আর এলাকার মানুষের শোকের ভারে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো রাঙ্গুনিয়ার আকাশ–বাতাস।
এক ভাইয়ের বিয়ে ঘিরে যে আনন্দের আলো জ্বলার কথা ছিল, তা নিভে গিয়ে রেখে গেল এক নির্মম বাস্তবতা—একসঙ্গে চার সহোদরের শেষ নিঃশ্বাস।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



