চট্টগ্রাম নগরের এক সরু গলি। সন্ধ্যার পরের অন্ধকারে হঠাৎ ছুটে আসে আতঙ্ক—গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। সেই আতঙ্কের মাঝেই থেমে যায় ১১ বছরের এক শিশুর জীবন।
রেশমি আক্তার। বয়স মাত্র এগারো। ব্যারিস্টার মিল্কি মেমোরিয়াল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট। হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিশুর পৃথিবী ছিল ছোট—স্কুল, পরিবার আর পাশের দোকান।
গত বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাতে মায়ের কথায় পাশের দোকানে কিছু কিনতে গিয়েছিল রেশমি। ফেরার পথে রৌফাবাদ কলোনির গলিতে আচমকা শুরু হয় গোলাগুলি। চারদিকে ছুটোছুটি, আতঙ্কে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় মুহূর্তগুলো। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝেই পড়ে যায় রেশমি।
একটি গুলি এসে লাগে তার চোখের নিচে। ভেতরে ঢুকে মাথার মধ্যে আটকে যায়। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রথমে ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা শুরু হয়। কিন্তু অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন পড়ে। তখন খালি বেড না থাকায় গভীর রাতে তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চমেকে আইসিইউ খালি হলে আবার সেখানে স্থানান্তর করা হয়।
গত শুক্রবার থেকে আইসিইউর ২৩ নম্বর বেডে নিথর পড়ে ছিল রেশমি। চিকিৎসকদের ভাষায়, হাসপাতালে আনার পর থেকেই তার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না—সে ছিল ‘ব্রেন ডেড’।
অবশেষে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকাল পৌনে ১০টায় শেষ হয়ে যায় তার লড়াই। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
একই ঘটনায় নিহত হন হাসান ওরফে রাজু (৩২) নামের এক যুবক। তিনি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা।
সম্প্রতি নাছির নামে এক ব্যক্তি নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি ছিলেন তিনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বায়েজিদ এলাকায় বোনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
কিন্তু সেই সংঘর্ষের গুলিই কেড়ে নিল এক নিরীহ শিশুর জীবন।
রেশমির বাবা রিয়াজ আহমেদ, স্থানীয়দের কাছে গুড্ডু নামে পরিচিত, একজন প্রতিবন্ধী সবজি বিক্রেতা। দারিদ্র্যের মধ্যেও সন্তানের স্বপ্ন বুনছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন এখন নিভে গেছে।
রৌফাবাদ কলোনির সেই গলি এখন নিশ্চুপ। কিন্তু সেখানে যেন এখনো ভেসে বেড়ায় এক প্রশ্ন—একটি শিশুর মৃত্যু কি কেবলই ‘ভুল সময়ে ভুল জায়গায়’ থাকার গল্প, নাকি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি



