হালদার জেলেদের জন্য সেলাই মেশিন, আসছে স্পিডবোটও!

প্রকাশিত: ০৪ জুলাই, ২০২৬ ২০:৩৭

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীকে রক্ষায় এবার শুধু আইনের কড়াকড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না সরকার।

নদীটির জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সচেতনতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

আজ দুপুরে চট্টগ্রামের রাউজানের হালদা তীরবর্তী ছাত্তারঘাট এলাকায় এক ব্যতিক্রমী আয়োজনে এই বার্তা স্পষ্ট করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

‘হালদা নদীর প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প (২য় পর্যায়)’-এর আওতায় মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সেখানে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়।

পোনা শিকারিদের জন্য স্পিডবোট, তবে রয়েছে শর্ত

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ হালদা পাড়ের জেলেদের দীর্ঘদিনের একটি চাওয়া পূরণের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, “হালদা নদীতে মাছের পোনা আহরণকারীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খুব শিগগিরই তাঁদের মধ্যে স্পিডবোট বিতরণ করা হবে।”

তবে এই সহায়তার পেছনে একটি বড় শর্ত জুড়ে দিয়ে মন্ত্রী হুঁশিয়ারি দেন, “এই সহায়তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অবৈধভাবে মা-মাছ বা মাছের পোনা আহরণ করা যাবে না।”

তিনি আরও বলেন, “হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণও সমানভাবে প্রয়োজন।”

মাছের পথের কাঁটা: স্লুইসগেট ও রাবার ড্যাম সরানোর উদ্যোগ

কৃষি সেচের সুবিধার্থে অতীতে নির্মিত বিভিন্ন অবকাঠামো যে হালদার মাছের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা অকপটে স্বীকার করেন মন্ত্রী।

তিনি জানান, কৃষি সেচের সুবিধার্থে নির্মিত বিভিন্ন স্লুইসগেট বর্তমানে হালদা নদীতে মাছের স্বাভাবিক চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে যেখানে সেচের প্রয়োজনে রাবার ড্যাম নির্মাণ অপরিহার্য, সেখানে বিকল্প হিসেবে সেচ পাম্প সরবরাহের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে।

অতীতের স্মৃতিচারণ ও বর্তমানের কৃষি সহায়তার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, “শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কৃষি সেচের পাশাপাশি মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন।

বর্তমান সরকারও সেই ধারাবাহিকতায় কৃষকবান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।” কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যাংক ঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন সহায়তামূলক উদ্যোগ কৃষকদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

একই সাথে হালদার পানি দূষণমুক্ত রাখতে শিল্পকারখানার বর্জ্য নির্গমন নিয়ন্ত্রণে মালিকদের সঙ্গে কঠোর আলোচনার আশ্বাস দেন তিনি।

টেকসই জীবিকার অঙ্গীকার

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন।

তিনি সরকারের মূল লক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, “সরকারের লক্ষ্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে হালদা নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।”

বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং টেকসই জীবিকা নিশ্চিতের মাধ্যমে হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ বলে তিনি জানান।

এক মঞ্চে প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা

চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় হালদা পাড়ের মানুষের এক মিলনমেলায়।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন।

এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, মৎস্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন, রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. রাহাতুল ইসলাম, হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন, চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা আক্তার, রাউজানের সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন ফাহিম, স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, জেলে ও মৎস্যজীবীরা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন।

মাঠপর্যায়ের জেলেদের সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন হাটহাজারী অঞ্চলের ডিম সংগ্রহকারী শফিউল আলম এবং রাউজান অঞ্চলের ডিম সংগ্রহকারী দলের প্রতিনিধি রোসঙ্গী আলম।

আলোচনা সভা শেষে এক আবেগঘন মুহূর্তে মন্ত্রী নদী থেকে আহরিত ডিম থেকে সফলভাবে রেণু উৎপাদনকারীদের মাঝে সেলাই মেশিন বিতরণ করেন।

এরপর ছাত্তারঘাট পয়েন্টে হালদা নদীর বুকে পরম মমতায় মাছের পোনা অবমুক্তকরণের মাধ্যমে শেষ হয় এই আশাজাগানিয়া আয়োজন।

হালদা পাড়ের মানুষের চোখে এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।

চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি