ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনশেষে যে যৎসামান্য উপার্জন, সেখানেও থাবা বসাতে চান তিনি।
নিজেকে পরিচয় দিতেন ক্ষমতাসীন দলছুট বা স্থানীয় বড় রাজনৈতিক দলের ছায়াতলে থাকা ‘সম্ভাব্য কাউন্সিলর’ হিসেবে।
কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ভিডিওর সূত্র ধরে অবসান ঘটল তার সেই দাপটের।
চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর এলাকায় ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে মনজুর আলম মঞ্জু নামে এক স্থানীয় বিএনপি নেতাকে আটক করেছে পুলিশ।
শনিবার (৪ জুলাই) রাতে এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। আটক মঞ্জু চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হিসেবে এলাকায় ব্যানার-পোস্টার সেঁটে আসছিলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হালিশহরের ভুক্তভোগী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলেন, “ফুটপাতের কয়েকটা টাকার ওপর আমাদের সংসার চলে। প্রতিদিন যদি চাঁদা দিতে হয়, তবে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেব কীভাবে? ওনার মতো বড় নেতার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস আমাদের ছিল না।”
তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, ফুটপাতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে ব্যবসা করা কয়েকজন ক্ষুদ্র বিক্রেতার কাছ থেকে এক ব্যক্তি জোরপূর্বক টাকা আদায় করছেন।
ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা ওই চাঁদাবাজকে ‘নেতা’ মঞ্জু হিসেবে শনাক্ত করেন।
এরপরই ফুঁসে ওঠে এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে মুখ বুজে সহ্য করা ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে নিয়মিত চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন।
বিষয়টি নজরে আসতেই নড়েচড়ে বসে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)।
হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণমাধ্যমকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা এবং এর পেছনের ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সামান্যতম সত্যতা মিললেও তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঞ্জুর বিরুদ্ধে এটিই প্রথম অপরাধের অভিযোগ নয়। বছরখানেক আগে সাধারণ মানুষের রান্নার এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডারে পানি ভরে ওজন কারচুপির এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধে।
সে সময়ও স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন তিনি। কিন্তু বারবার ভোল বদলে রাজনীতির ছায়াতলে এসে পার পেয়ে যেতেন এই অভিযুক্ত।
এবার ফুটপাতের গরিব মানুষের পকেট কাটার অভিযোগে অবশেষে বন্দি হলেন তিনি।
হালিশহর থানা সূত্র জানিয়েছে, আটক মঞ্জুকে কেবল জিজ্ঞাসাবাদই করা হচ্ছে না, বরং এই চাঁদাবাজির অর্থ আসলে কোথায় যেত, এর পেছনে কোনো বড় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চক্রের হাত রয়েছে কি না-তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ফুটপাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পুরো সিন্ডিকেটটিকে উপড়ে ফেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে পুলিশ।
দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের কান্না আর ক্ষোভের যে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিল, মঞ্জুর আটকের মধ্য দিয়ে তার একটি সাময়িক স্বস্তির অধ্যায় রচিত হলো।
তবে হালিশহরের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের দাবি-সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই ‘সম্ভাব্য কাউন্সিলর’ যেন তার উপযুক্ত শাস্তি পান, যাতে আর কোনো প্রভাবশালী ফুটপাতের গরিবের পেটে লাথি মারার সাহস না পায়।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

