আজ সকাল ১০টার দিকে নগরের ইস্পাহানি সি-গেট এলাকায় গিয়ে সরেজমিন দেখা যায়, এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয়। সড়কজুড়ে থইথই করছে হাঁটু সমান নোংরা পানি।
সেই পানি মাড়িয়েই কোনোমতে চলছে গণপরিবহন। ছাতা আর রেইনকোট গায়ে জড়িয়ে অফিসগামী মানুষগুলোকে লড়াই করতে হচ্ছে প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সাথে। কিন্তু দুর্ভোগ যেন পিছু ছাড়ছে না।
রাজপথে রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার তীব্র সংকট। আর এই সুযোগে পকেট কাটছেন চালকেরা। অতিরিক্ত ভাড়ার দাবিতে অসহায় সাধারণ মানুষ।
ইস্পাহানি সি-গেট মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেসরকারি চাকরিজীবী মনিরুলের ক্ষোভ ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, সপ্তাহের প্রথম দিন অফিস ধরতেই হবে। কিন্তু এসে দেখি রাস্তা উধাও, সব পানির নিচে!
এক কিলোমিটার রাস্তার জন্য রিকশাচালক তিন গুণ ভাড়া চাচ্ছেন। পকেটের টাকা আর গায়ের ঘাম-দুই-ই একসাথে ঝরছে। আমাদের এই কষ্ট দেখার কেউ নেই।
ব্যাহত শিক্ষা, বন্দি শৈশব ভারী বৃষ্টির এই তাণ্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আজকের পরীক্ষা ও নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের আগেই অনেক শিক্ষার্থী ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ে চরম বিপাকে।
একাদশ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সুমি দাশ জানালেন, বাচ্চাটাকে নিয়ে সকালে ভিজতে ভিজতে কলেজে গেলাম। গিয়ে শুনি পরীক্ষা স্থগিত। এখন এই নোংরা পানি ভেঙে বাড়ি ফেরাটাই বড় যুদ্ধ। সন্তানদের পড়াশোনা আর নিরাপত্তা দুটোই এখন বৃষ্টির পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও পাহাড় ধসের নতুন শঙ্কা আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির এই প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রামেও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই অতি বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানান, রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৩৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
যার মধ্যে রোববারের আগের ১২ ঘণ্টাতেই বৃষ্টি হয়েছে ১২৯ মিলিমিটার। এই পরিস্থিতি এখনই কাটছে না; বৃষ্টি আরও দুই থেকে তিন দিন স্থায়ী হতে পারে।
আগ্রাবাদ থেকে চকবাজার সর্বত্রই নতুন করে শঙ্কার কালো মেঘ এর আগে গত মঙ্গলবার এক দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের ৪৩ বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল।
যার প্রভাবে আগ্রাবাদ, হালিশহর, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, চকবাজার, কাতালগঞ্জ ও পতেঙ্গাসহ বিভিন্ন নিচু এলাকার বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছিল।
গত দুই দিনে বৃষ্টি কমায় পানি কিছুটা নামলেও, আজকের নতুন এই বর্ষণ সাধারণ মানুষের মনে ফের এক নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে।
চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নবী হতাশার সুরে বলেন, গত মঙ্গলবারের পানিতে দোকানের অর্ধেক মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। দুই দিন ধরে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করলাম।
আজ আবার যেভাবে পানি বাড়ছে, তাতে বুকটা কাঁপছে। আমরা কি কর দেব শুধু পানিতে ডুবে মরার জন্য?
চট্টগ্রামের এই জলাবদ্ধতা কেবল আর কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি এখন লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা আর স্বপ্নের ওপর এক নীরব আঘাত।
একদিকে পাহাড় ধসের আতঙ্ক, অন্যদিকে ঘরের ভেতর নোংরা পানির হানা-এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে চাটগাঁবাসী এখন শুধু চাতক পাখির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করছে, কবে থামবে এই মেঘের কান্না, আর কবে মুক্তি মিলবে এই জলবন্দি অভিশাপ থেকে?
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি