ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা যখন ধাপে ধাপে রূপ নেয় পারিবারিক ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর পুঁজিতে, তখন তা আর সাধারণ আর্থিক অনিয়ম থাকে না। হয়ে ওঠে আস্থার এক সুক্ষ্ম চাতুর্যপূর্ণ ব্যবচ্ছেদ।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের বহুল আলোচিত মামলাটি যেন সেই চাতুর্যেরই এক প্রামাণ্য দলিল।
সোমবার (১৩ জুলাই) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মিজানুর রহমানের আদালতে এই মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় যোগ হলো আরও একটি নতুন অধ্যায়।
এদিন আদালতে হাজির করা হয় আরও ৪ জন সাক্ষীকে। তাদের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে মামলায় এ পর্যন্ত মোট ৩১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলো।
কিন্তু এই আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে যে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশের গল্প লুকিয়ে আছে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে ভাবিয়ে তুলতে বাধ্য।
দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকাররম হোসাইন মামলার অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করলেও, এই মামলার অভিযোগপত্রের পাতা ওল্টালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কীভাবে একটি ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বকে পারিবারিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল।
গত ৫ জানুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমান যে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছিলেন, তার পরতে পরতে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র।
মামলার মূল অভিযুক্ত সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ (৫৬)। তবে গল্পটা শুধু তাঁর একার নয়। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কীভাবে ভেঙে পড়েছিল, তা বোঝা যায় আসামির তালিকা দেখলে।
যেখানে যুক্ত আছেন-ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ নেতৃত্ব, জাবেদের স্ত্রী তথা ইউসিবিএল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান (৪৬), সাবেক পরিচালক আসিফুজ্জামান চৌধুরী (৪৬) ও রোকসানা জামান চৌধুরী (৫৬)।
প্রভাবশালী পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা: সাবেক চেয়ারম্যান এম এ সবুর (৭৭) এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ কাদরীসহ (৬৪) একঝাঁক সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তা।
যখন একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান, পরিচালক এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতো শীর্ষ পদগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রভাব বলয়ের আজ্ঞাবহ হয়ে পড়ে, তখন আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা কেবল কাগজের কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
এই আত্মসাতের সবচেয়ে অভিনব ও চাঞ্চল্যকর দিকটি হলো সাবেক মন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘আরামিট গ্রুপ’-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহার।
২৫ কোটি টাকা সরাতে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের এজিএম উৎপল পাল, প্রদীপ কুমার বিশ্বাসসহ প্রায় ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, ওপর মহলের নির্দেশে নিচের স্তরের কর্মচারীরা সই করেছেন, অ্যাকাউন্ট খুলেছেন কিংবা টাকা স্থানান্তরে সহায়তা করেছেন।
প্রশ্ন ওঠে, এই সাধারণ কর্মচারীরা কি স্রেফ চাকরি বাঁচানোর তাগিদে এই অপরাধের অংশ হয়েছিলেন, নাকি পর্দার আড়ালের মূল নায়কদের আড়াল করতেই তাদের সামনে আনা হয়েছিল?
৩১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়া নিঃসন্দেহে মামলার ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এই মামলার গভীরতা কেবল ২৫ কোটি টাকার অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেশের ব্যাংকিং খাতের এক গভীর ক্ষতের বহিঃপ্রকাশ।
সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় তদন্ত কর্তৃপক্ষের জন্য এখনই সময়-এই ২৫ কোটি টাকার বাইরেও এই চক্রের মাধ্যমে আরও কোনো অর্থ পাচার বা আত্মসাৎ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে গেলে যে কী ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে, তা আমলে নিয়ে ব্যাংকিং নীতিমালায় কঠোর সংস্কার আনা।
আদালতের কাঠগড়ায় এখন ৩৬ জন আসামি। সাক্ষীদের একের পর এক বয়ানে উন্মোচিত হচ্ছে ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্ধকার দিকগুলো।
আসামিদের তালিকায় রয়েছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ (৫৬), তাঁর স্ত্রী ও ইউসিবিএল ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামান (৪৬), সাবেক পরিচালক আসিফুজ্জামান চৌধুরী (৪৬) এবং রোকসানা জামান চৌধুরী (৫৬)।
এ ছাড়া সাবেক পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন বশির আহমেদ (৫৫), আফরোজা জামান (৪৮), সৈয়দ কামরুজ্জামান (৬১), মো. শাহ আলম (৬২), মো. জোনাইদ শফিক (৬৪), অপরূপ চৌধুরী (৬৫), তৌহিদ সিপার রফিকুজ্জামান (৬৬), ইউনুছ আহমদ (৭৯), হাজী আবু কালাম (৭৯), নুরুল ইসলাম চৌধুরী (৬২), সাবেক চেয়ারম্যান এম এ সবুর (৭৭) এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ কাদরী (৬৪)।
ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে আসামি করা হয়েছে মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ (৫১), আবদুল হামিদ চৌধুরী (৫০), আবদুর রউফ চৌধুরী, জিয়াউল করিম খান (৪৬), মীর মেসবাহ উদ্দীন হোসাইন (৬২) এবং বজল আহমেদ বাবুলকে (৫৬)।
মামলায় আরামিট গ্রুপের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মোহাম্মদ ফরমান উল্লাহ চৌধুরী (৫১), মোহাম্মদ মিছবাহুল আলম (৫০), আব্দুল আজিজ (৩৯), মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (৫৪), মোহাম্মদ হোছাইন চৌধুরী (৪৮), ইয়াছিনুর রহমান (৪৩), ইউছুফ চৌধুরী (৪৫), সাইফুল ইসলাম (৪৫), এজিএম উৎপল পাল (৫১), প্রদীপ কুমার বিশ্বাস (৫১), মো. জাহিদ (৪৫), মো. শহীদ (৪৯), মো. সুমন (৩৯), ইলিয়াস তালুকদার (৫০) এবং ওসমান তালুকদার (৪৮)।
এখন দেখার বিষয়, এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাতকারীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি হন কি না, নাকি আইনি মারপ্যাঁচে আড়ালেই থেকে যায় মূল সত্য।
চট্টগ্রাম সংবাদ প্রতিদিন/আরএসপি

